
খেলাধুলা ডেস্কঃ দুই যুগ পর ভারতে পা রেখে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়লেন আর্জেন্টাইন ফুটবল সুপারস্টার লিওনেল মেসি। জিওএটি ট্যুরের অংশ হিসেবে কলকাতায় আসার পর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আয়োজকদের অব্যবস্থাপনায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মেসিকে সরাসরি দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা ভাঙচুর চালান।
পরে আয়োজক প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ঘটনার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় ক্ষমা চান। এই বিশৃঙ্খলার খবর ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও।
কলকাতার সেই দিনের ঘটনা নিয়ে ধীরে ধীরে সামনে আসছে নানা অস্বস্তিকর তথ্য। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয়ে ওঠে যে, নিজ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা অনুভব করতে শুরু করেন লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, রদ্রিগো ডি পল।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যুবভারতীর চার ও পাঁচ নম্বর গ্যালারির মাঝের পথে এসে থামে মেসির গাড়ি। গাড়ি থেকে নামতেই তাকে ঘিরে ধরেন শতাধিক মানুষ। উদ্যোক্তা, আলোকচিত্রী, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং তাদের ঘনিষ্ঠজনদের ভিড়ে মেসি কার্যত আটকে পড়েন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে ছিলেন। প্রভাবশালীদের ভিড় মেসির সঙ্গে সঙ্গে এগোতে থাকে এবং ছবি তোলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে মরিয়া সেলফি শিকারিদের একজনের কনুইয়ের গুঁতো লাগে লুইস সুয়ারেজের পেটে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আরেকজনের নখের আছড় লাগে রদ্রিগো ডি পলের হাতে।
মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও স্পষ্ট অস্বস্তিতে ছিলেন মেসি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা আর ঝুঁকি নেননি। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মেসি, সুয়ারেজ, ডি পলদের মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ওইদিন মাঠে উপস্থিত ভারতের ফুটবলারদের কেউ কেউ এই দৃশ্য লক্ষ্য করেন। রহিম নবি বলেন, অনেকেই মেসি, সুয়ারেজ, ডি পলদের ঘাড়ের কাছে চলে যাচ্ছিলেন। কয়েক মিনিট পরিস্থিতি দেখে মেসি নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে মাঠ ছাড়েন। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল ভিড়ের মধ্যে তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন।
দীপেন্দু বিশ্বাস জানান, পেনাল্টি নেওয়ার কথা ছিল মেসির। সে জন্য তিনি গোলপোস্টের দিকেও যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাকে আবার ভিড়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। সংগ্রাম মুখোপাধ্যায়ের ভাষ্য, মেসিকে ঠিকমতো হাঁটতেও দেওয়া হচ্ছিল না, কোনও দিক দিয়েই ভিড় থেকে বেরোতে পারছিলেন না।
ঘটনার পেছনে অব্যবস্থাপনার একের পর এক চিত্র উঠে এসেছে। ন্যূনতম পরিকল্পনার অভাবের পাশাপাশি দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর মধ্যে কোনও সমন্বয় ছিল না। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, পশ্চিমবঙ্গের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের মধ্যে মেসিকে দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতাই বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত করে।
শুক্রবার দিবাগত রাতে কলকাতায় পৌঁছানোর পর মেসিকে নিজের দখলে নেন সুজিত বসু। হায়াত রিজেন্সি হোটেলে মেসিকে ঘিরে থাকেন তার লোকজন। শ্রীভূমির সামনে ৭০ ফুট মূর্তি উন্মোচনসহ সারাক্ষণই মেসির পাশে ছিলেন তিনি এবং মঞ্চে হাজির করেন তার মেয়েকেও।
মেসি মাঠে ঢুকতেই সেই দখল চলে যায় ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের হাতে। মাঠে ঢোকার পর তাকে ঘিরে ধরেন অরূপ ও তার ঘনিষ্ঠরা। ছবি তোলার টানাহ্যাচড়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা অরূপ বিশ্বাসকে সরিয়ে দেন।
এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে প্রায় এক ঘণ্টা থাকার কথা থাকলেও মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যেই মাঠ ছাড়েন লিওনেল মেসি। তার এই দ্রুত প্রস্থান হাজার হাজার দর্শকের হতাশা ও ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়।
ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ ছিল নিয়ন্ত্রণহীন ভিআইপি সংস্কৃতি। এনডিটিভি লিখেছে, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের ভিড়ের কারণেই সাধারণ দর্শকেরা মেসিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাননি।

