
বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে যখন নানা পত্রিকা অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ করছে, তখনই একদল স্বার্থান্বেষী সাংবাদিককে নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। তারা নিজেরা সংবাদকর্মী হলেও দায়িত্ব পালন না করে বরং কিছু প্রভাবশালী প্রকৌশলীর প্রতি আনুগত্য দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নানা অনলাইন পোর্টালে হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে এমন কিছু প্রতিবেদন, যেগুলো আসলে সাংবাদিকতা নয়—বরং নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষায় ‘সাফাই প্রচার’।
সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম শাখার প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ–এর নাম জড়িয়ে কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে ইতিবাচক, অতিরিক্ত প্রশংসামূলক ও প্রশ্নবোধক কিছু রিপোর্ট। এসব রিপোর্টে দেখা গেছে—একটি পত্রিকা অনিয়ম নিয়ে যখন অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করেছে, তখনই আরেক পত্রিকা বা পোর্টাল ঠিক তার উল্টো সুরে কায়কোবাদকে ‘সৎ, দক্ষ ও নিন্দিত হওয়ার অযোগ্য’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। যেন গণমাধ্যমের দায়িত্ব তথ্য তুলে ধরা নয়—কাউকে রক্ষা করা।
গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা বলছেন—এ ধরনের পাল্টা-রিপোর্ট আসলে সংবাদপত্র আইন ১৯৭৩–এর মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সাংবাদিকতার পেশাগত নীতিমালায় ‘স্বার্থসংঘাত’ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু এখানে সংবাদকে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘পিআর টুল’ হিসেবে। আইনজীবীদের মতে, কোনো রিপোর্টে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে পারেন—কিন্তু এক পত্রিকার রিপোর্ট ঢাকতে আরেক পত্রিকার পক্ষে গিয়ে ব্যক্তিগত সাফাই দেওয়া আইনসম্মত নয়, এটি সরাসরি প্রেস এথিকস ভঙ্গ।
এই পাল্টা সাংবাদিকতার আরেকটি বড় সমস্যা হলো—ভুল ছবি, ভুল পরিচয়, অযথা ব্যক্তির প্রশংসা, অসংগত তথ্য জোড়া লাগানো। অভিজ্ঞ এক সম্পাদক তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এসব ভুল কেবল অদক্ষতা নয়, বরং জনমত বিভ্রান্ত করার কৌশল। যেসব পত্রিকা সাধারণত অনিয়ম উন্মোচন করে, সেগুলোকে টার্গেট করেই এই ‘সাফাই সাংবাদিকতা’ চালানো হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ভেতরের অবস্থার কথা তুলে ধরেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। তাঁদের ভাষায়, গণপূর্তের প্রভাবশালী কয়েকজন প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন সাংবাদিককে ব্যবহার করছেন নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে। কোনো অনিয়ম প্রকাশিত হলেই শুরু হয়—অভিযুক্ত কর্মকর্তার ছবি এড়িয়ে অন্য কারো ছবি ব্যবহার, অনলাইনে হঠাৎ প্রশংসামূলক নিউজের বন্যা, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের কাছে ফোন করে ‘নরম করার চেষ্টা’, এবং আরেক পত্রিকার মাধ্যমে প্রথম রিপোর্টকে ভুল প্রমাণের খেলা। তাদের কথায়, “দুর্নীতির রিপোর্ট দেখলেই ওরা দালাল সাংবাদিক পাঠায়।”
দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো সত্য প্রকাশ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো—যেখানে একটি পত্রিকা প্রশ্ন তুলছে, সেখানে অন্য পত্রিকা সেই প্রশ্নকে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগছে। এতে প্রকৃত সত্য আড়ালে পড়ে যায়, জনমত বিভ্রান্ত হয় এবং দুর্নীতিবাজরা বাঁচার সুযোগ পায়।
দেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও গণযোগাযোগবিদরা এ পরিস্থিতিকে গণমাধ্যমের জন্য একটি ভয়ংকর বিপদ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সংবাদ কখনোই ব্যক্তিবিশেষের ঢাল হতে পারে না। সাংবাদিকতা সত্য উদ্ঘাটনের জায়গা, কারো ব্যক্তিগত প্রচারের প্ল্যাটফর্ম নয়। এভাবে স্বার্থান্বেষী প্রকৌশলী ও কিছু সাংবাদিকের যোগসাজশ চলতে থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরো অস্বচ্ছ হবে, আর দুর্নীতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়। এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—যে পত্রিকা অনিয়ম প্রকাশ করে, তারা হয় চাপের মুখে পড়ে; আর যে পত্রিকা অনিয়ম আড়াল করে, তারা নানা সুবিধা পায়। এটি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণ—তিন পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর।
সবশেষে বলা যায়—সংবাদকে অস্ত্র বানিয়ে অনিয়ম আড়াল করা গণতন্ত্রের জন্য সরাসরি হুমকি। এক পত্রিকার রিপোর্ট ঠেকাতে আরেক পত্রিকার সাফাই কেবল অপেশাদার সাংবাদিকতা নয়, এটি সত্যকে চাপা দেওয়ার ভয়ংকর প্রচেষ্টা। প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং এবং যথাযথ তদন্ত—গৃহপালিত সাংবাদিকতা নয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472