
এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মালিক খসরুকে ঘিরে অনেক দিন ধরেই নানা অভিযোগ ঘুরছে অফিসের ভেতরে। সহকর্মীরা ব্যঙ্গ করে তাকে “মালের খসরু” বলে ডাকেন। কারণ, অভিযোগ আছে—তিনি সরকারি পদে থেকেও টাকা-পয়সার দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক দেখান এবং সুযোগ পেলেই সুবিধা নেন।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মালিক খসরু বহু বছর ধরে ঢাকাতেই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কাজ করছেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে বারবার একই এলাকায় রাখার নিয়ম নেই। কিন্তু তার ক্ষেত্রে নাকি অনেক নিয়মই আলাদা ভাবে কাজ করেছে। অভিযোগ আছে—একজন প্রভাবশালী সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ “মুরীদ” হওয়ায় তিনি এমন সুবিধা পেতেন।
অধিদপ্তরের ভেতরের লোকজন বলেন, শামীম আখতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে খসরু নিজের পদোন্নতি, পদায়নসহ নানা সুবিধা নিতেন। শোনা যায়, এমন সম্পর্কের কারণেই তিনি ই/এম শাখার লোভনীয় পদগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে গেছেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ঢাকা আজিমপুর সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারের বহুতল ভবন ও কার পার্কিং প্রকল্প নিয়ে। খসরু এখানে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ আছে—প্রকল্প চলাকালীন সময় ঠিকাদারদের কাছে বিভিন্ন অজুহাতে কমিশন দাবি করতেন। যেমন—ফাইল আটকে রাখা, রিপোর্টে সাইন না করা বা সাইট ভিজিট প্রয়োজন—এসব দেখিয়ে নাকি তাদের চাপ দিতেন। কিছু ঠিকাদারের ভাষায়, “টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাগজ সই করতেন না।”
আরও অভিযোগ আছে—আজিমপুরের কয়েকটি ভবনে যেসব সাবস্টেশন, জেনারেটর, ফায়ার সেফটি বা ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম বসানো হয়েছে, সেগুলোর মান অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। ঠিকাদারদের দাবি, মালিক খসরু ইচ্ছে করেই কম দামের ব্র্যান্ড অনুমোদন করতেন, কারণ সেখান থেকেই নাকি কমিশন পাওয়া সহজ ছিল। এ কারণে ভবনগুলোর কিছু জায়গায় এখন বিদ্যুৎ সমস্যা, ফায়ার অ্যালার্ম না বাজা বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
অর্থবছর ২০২৪–২৫ এ ছোটো কিছু মেরামত কাজের পাশাপাশি প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের সাবস্টেশন ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের বড় কাজও ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বড় কাজ থেকেই তিনি ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন লেনদেন করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।
আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—মালিক খসরুর নামে ও তার পরিবার-আত্মীয়দের নামে নাকি বেশ কিছু ব্যাংক হিসাব রয়েছে। গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ঘুষ নেওয়ার টাকাগুলো এসব হিসাব ব্যবহার করে লেনদেন করা হত। এমনকি, কিছু টাকা বিদেশেও পাঠানো হতো বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। খিলগাঁওয়ে অ্যাপার্টমেন্ট, টাঙ্গাইলে জমি, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা—এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেন, খসরুর সঙ্গে কাজ করতে গেলে তাদের ব্যক্তিগত আপ্যায়ন পর্যন্ত করতে হত—হোটেলে খাওয়ানো থেকে শুরু করে বাইরে ঘোরানো পর্যন্ত। তবুও নাকি তিনি সাইটে গিয়ে নানা কারণে হয়রানি করতেন।
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন—বেশি প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ খুব কম আসে। অভিযোগ এলেও তদন্ত অনেক সময় এগোয় না। কারণ, অভিযোগ এসেছে—উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন যায় মামলা বা তদন্ত থামানোর জন্য।
এখন দুদক ও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ইউনিট তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব ও লেনদেন নিয়ে নজরদারিতে রেখেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর পক্ষে এত সম্পদ অর্জন স্বাভাবিক নয়। তাই প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

