বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাল কাগজপত্র ও ভুয়া শিক্ষাসনদ ব্যবহারের অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় শাস্তি পেয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। সরকারি নথিতে ওই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তার লিখিত জবাবে দোষ স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার তথ্যও রয়েছে। তবে গুরুতর অভিযোগে শেষ পর্যন্ত তাকে বড় কোনো শাস্তি না দিয়ে এক বছরের জন্য একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছি
এই শাস্তির কয়েক বছরের মধ্যেই তার দ্রুত পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, বদলি-পদায়ন, দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। তাকে ঘিরে ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি এবং রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা খালেকুজ্জামানকে স্থায়ীভাবে ওই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে বদলি-বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, নথি নিয়ে অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগের বেশিরভাগই এখনো তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি। ফলে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত বিভাগীয় মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ছুটি ও প্রেষণ নেওয়ার ক্ষেত্রে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া অফার লেটারসহ শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত জবাব চাওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, তিনি অভিযোগের দায় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এরপর ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার স্বাক্ষরিত আদেশে তার একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।
অর্থাৎ, সরকারি নথিতে জাল কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির বিষয়টি রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এমন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন অপেক্ষাকৃত লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তার চাকরিজীবনে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি কেন?
সার্ভিস রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বিভাগীয় শাস্তির প্রায় তিন বছর পর ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে নিয়মিত পদোন্নতি পান। এর মাত্র কয়েক মাস পর, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে উন্নীত হন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তি পাওয়া একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এত দ্রুত পদোন্নতির সময় তার অতীত শাস্তির রেকর্ড কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তবে পদোন্নতির সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল—এমন অভিযোগের পক্ষে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তমূলক নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটির কার্যবিবরণী ও মূল্যায়ন নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চাকরিজীবন নিয়ে আলোচনায় বারবার এসেছে রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক বলয়ে যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন।
তবে সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর এ ধরনের সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি অবগত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একই নির্বাচনি এলাকার হওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি তার মায়ের কাছে আসতেন এবং তাদের কেউ কেউ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখানোর জন্য আত্মীয়তার সম্পর্কের দাবি করতেন।
ফলে খালেকুজ্জামানের কথিত পারিবারিক সম্পর্ক বাস্তবে তার প্রশাসনিক সুবিধা বা পদোন্নতিতে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটি আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ সময় তিনি জামায়াত-ঘনিষ্ঠ পরিচয় সামনে আনেন।
এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পরিবারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। একই উপজেলার ফুলসুতি গ্রামে ডা. তাহেরের শ্বশুরবাড়ি। পারিবারিক সূত্রের কারণে ডা. তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে তিনি ‘ফুপু’ বলে সম্বোধন করেন—এমন দাবিও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই যোগাযোগ এবং তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের প্রভাবের কারণে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে পেছনে ফেলে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পান।
তবে এ নিয়োগে রাজনৈতিক সুপারিশ সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মধ্যে মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দে তার আগে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ জ্যেষ্ঠতার হিসাবে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অবস্থান তৃতীয়।
কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী পদে স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তার নাম অগ্রাধিকার পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ৬ জুলাই প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের বিবেচনায় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই তালিকা তৈরিতে স্বাভাবিক জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসরণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে প্রশ্ন হলো—কোন মানদণ্ডে ওই তালিকা তৈরি হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার তুলনামূলক মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছিল।
খালেকুজ্জামানের চেয়ে জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীকে পদোন্নতির প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ব্যবহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রামপুরা থানায় দায়ের করা একটি মামলায় জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীসহ ৪৭ জনকে আসামি করা হয়। পরে ওই মামলার তথ্য পদোন্নতি সংক্রান্ত বিবেচনায় উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে কোনো মামলায় কারও নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতের রায় ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা আইনগতভাবেও সমীচীন নয়। তাই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ওই মামলার তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা কোনো কর্মকর্তাকে সুবিধা বা অসুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।
প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলি ও পদায়ন নিয়েও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে পোস্টিং দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছেন।
তবে এসব আর্থিক লেনদেনের কোনোটি এখনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি।
চলতি বছরের ৩ মার্চ একদিনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে অধিকাংশ বদলি বাতিল করা হয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—একসঙ্গে এত কর্মকর্তাকে বদলির প্রয়োজন কেন হয়েছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি কী ছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কেন অধিকাংশ আদেশ প্রত্যাহার করা হলো।
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বদলি প্রস্তাব, নোটশিট, অনুমোদন, আদেশ জারি ও বাতিলের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তনের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বরখাস্ত প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে ঘিরেও প্রশাসনিক নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির দায়ে সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করে। আদেশে তাকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি আদেশে দেখা যায়, ২ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকার রিজার্ভে বদলি দেখানো হয়েছে। কিন্তু ওই আদেশ প্রকাশ করা হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি।
এ কারণে অভিযোগ উঠেছে, বরখাস্তের আগের তারিখ দেখিয়ে পরে আদেশ তৈরি বা প্রকাশ করা হয়েছিল কি না।
তবে এটিকে নথি জালিয়াতি হিসেবে চূড়ান্তভাবে বলার আগে মূল নথি, ফাইলের অনুমোদনের তারিখ, ডাক রেজিস্টার, ডিজিটাল ফাইলের টাইমস্ট্যাম্প এবং আদেশ জারির প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ বড় অঙ্কের দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর অধীনে কয়েকটি বড় দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানোর ঘটনা সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের বিভিন্ন বিষয়কে কারণ হিসেবে দেখিয়ে দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হলেও এর পেছনে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তবে কোনো দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রকৃত বিষয় জানতে হলে মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, নোটশিট, পুনর্মূল্যায়নের লিখিত কারণ, দরদাতাদের প্রস্তাব এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে বিধিসম্মত কারণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়েছে, তখন বিষয়টি প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের পর্যায়ে যেতে পারে।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
অভিযোগে বদলি ও পদায়নে আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বরখাস্ত কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্কিত বদলি আদেশের বিষয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি সংগ্রহ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যাংক লেনদেন যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
তবে দুদকে অভিযোগ জমা পড়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তের ফলাফলের ওপরই এর সত্যতা নির্ভর করবে।
খালেকুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগের মধ্যে একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার বিষয়টিও এসেছে।
২০ জুলাই ২০২৬ একজন সাংবাদিক মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে সংবাদসংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগের সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং তার পেশা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়।
থানার নথিতে সাধারণ ডায়েরিটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে এবং বিষয়টি আইনগতভাবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানা গেছে।
এই অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। কারণ অভিযোগটি সত্য হলে একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে সাংবাদিকের মতবিরোধের বিষয়টি ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, বিভিন্ন সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন। কখনো সাবেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেত্রীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কথা, আবার পরবর্তী সময়ে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা নিজে কোনো অপরাধ নয়। প্রশ্ন হলো—এসব সম্পর্ক সরকারি পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না।
এর উত্তর পেতে প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি, সুপারিশ, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে থাকলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের আগে তার পূর্ববর্তী রেকর্ড যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।
তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদ-পদবি অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়েন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়।
খালেকুজ্জামানের ক্ষেত্রে তাই ২০১৬ সালের বিভাগীয় শাস্তির বিষয়টি পরবর্তী পদোন্নতি ও নিয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে মূল্যায়ন করেছিল—এ প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে ১০ আগস্ট তার দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপনের সুযোগ থাকলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে কিছু সরকারি নথি দ্বারা সমর্থিত, আবার কিছু অভিযোগ এখনো কেবল অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সব অভিযোগকে একই মাত্রায় সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
২০১৬ সালে বিভাগীয় শাস্তি পাওয়ার পর কীভাবে তার ক্যারিয়ার দ্রুত এগিয়ে গেল? জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অবস্থান তৃতীয় হওয়া সত্ত্বেও প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব এবং স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তার অগ্রাধিকার পাওয়ার কারণ কী? একদিনে বিপুলসংখ্যক বদলি দিয়ে পরে অধিকাংশ আদেশ বাতিলের পেছনে প্রশাসনিক কারণ কী ছিল? আর টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্তগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ সুবিধা পেয়েছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, ফাইলের গতিবিধি, পদোন্নতি ও নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, বদলি আদেশ, দরপত্র মূল্যায়ন, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত।
গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। ফলে এর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগগুলো সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান প্রশ্নের অবসান হওয়া উচিত। আর অভিযোগের কোনো অংশ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472