
বিশেষ প্রতিবেদকঃ ভূমি অধিদপ্তরের ই-ডিএলএমএস (ই-ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) প্রকল্পে আউটসোর্সিং নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বহু চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। টাকা দিয়েও কেউ চাকরি পাননি, আবার অর্থ ফেরতও দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক ভুক্তভোগী আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
এই ঘটনায় মো. হাবিবুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগে বলা হয়, স্টেট সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান এবং তার শ্যালক জাকির হোসেন চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে প্রথমে ২ লাখ টাকা নেন। পরে বিভিন্ন অজুহাতে আরও ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ভুক্তভোগীকে ইসলামী ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাব নম্বর ২০৫০২০৫০২১৪৪৮৪১০-এ টাকা জমা দিতে বাধ্য করা হয়।
অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি তারিখে ২ লাখ টাকা অগ্রিম জমা দেওয়ার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ দেওয়ার কথাও নথিতে উল্লেখ ছিল। একই অ্যাকাউন্ট নম্বর বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো লেনদেনকে পরিকল্পিত প্রতারণার ইঙ্গিত দেয়। এসব কাগজপত্র ও ব্যাংক লেনদেনকে ঘুষ, আর্থিক জালিয়াতি এবং প্রতারণার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে কিছু নির্দিষ্ট আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে ই-ডিএলএমএস প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে চেইনম্যান, সার্ভেয়ার ও কম্পিউটার অপারেটরের মতো পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। প্রার্থীদের বলা হতো, সবকিছু “উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনে” হচ্ছে এবং “প্রকল্প পরিচালকের সুপারিশ” রয়েছে। পরে এসব কথাই যে মিথ্যা ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই প্রতারণার শিকারদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেকেই পরিবারের জমানো টাকা, ঋণ কিংবা স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু চাকরি না পেয়ে তারা এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত। কেউ কেউ পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। শক্তিশালী এই চক্রের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, সরকারি বা সরকারি প্রকল্পের নিয়োগে টাকা নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। লিখিত নির্দেশনা ও টাকা নেওয়ার প্রমাণই দেখায় যে এটি একটি সাজানো নিয়োগ বাণিজ্য। টাকা নেওয়ার পর অভিযুক্তরা চাকরি দেয়নি, আবার অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগও নেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আউটসোর্সিং নিয়োগে যথাযথ সরকারি নজরদারি না থাকায় এ ধরনের দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুধু চাকরিপ্রার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এত বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন উচ্চপর্যায়ের প্রভাব ছাড়া সম্ভব নয়।
এই অবস্থায় ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চান। তারা অভিযুক্ত এমডি মিজানুর রহমান, জাকির হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, নেওয়া অর্থ ফেরত, ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472