
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ
আওয়ামী আমলে দুর্নীতির আঁকড়ায় পরিনত হয়েছিল গোটা দেশ, সরকারের ছত্রছায়ায় ঝাড়ুদার থেকে এমপি মন্ত্রী আমলা কেউই অভিযোগ থেকে বাদ পড়েনি।
দৈনিক খবর বাংলাদেশ পত্রিকার অনুসন্ধানী টিম কর্তৃক অপরাধ অনুসন্ধান মুলক অনুষ্ঠান (ক্রাইম ফোকাস) এর হাতে এমন একটি দুর্নীতির তথ্য এসেছে যা রীতিমতো অবাক বিষয়।
কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানাধীন বড়কান্দা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক দফাদার শ্রী আকালী চন্দ্র দাস মৃত্যুর সময় স্ত্রী, তিন পুত্র, চার কন্যা সন্তান রেখে পরপারে চলে যান। অভাবের সংসার সামলাতে হিমসিম খেতে হচ্ছিল তার পরিবারের। তৎকালীন চেয়ারম্যানের সহমর্মিতায় পিতা আকালীর স্থলে বড় ছেলে শ্রী লোকনাথ চন্দ্র দাসকে উক্ত স্থলে যোগদান করান। অক্ষর জ্ঞানহীন সামান্য কাঠমিস্ত্রী থেকে শ্রী লোকনাথ চন্দ্র দাস হয়ে যান সরকারি চাকুরিজীবি। নিজ এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের দফাদারের চাকুরী পেয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যানের সাথে আতাত করে দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে শুরু করে, সেই থেকে তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
বড়কান্দা ইউনিয়ন পরিষদের ৯টি ওয়ার্ডের নিজ ক্ষমতাবলে চৌকিদারের শুন্যপদে পরিবারের লোকজন নিয়োগ করিয়েছেন বলে জানা গেছে। তন্মধ্যে ২০১২ সালে ৪নং ওয়ার্ডে নিজ স্ত্রী শ্রী জোসনা রানীকে যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ করান। জানাযায় ১৪ বছর শ্রী জোসনা রানী চৌকিদারের দায়িত্ব পালন না করেই সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ মাস প্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা মোট ১২লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার তিনি জানতেন না জোসনা রানী চৌকিদারের চাকুরী করেন। এছাড়া আপন ছোট ভাই ত্রিনাথকেও চৌকিদারের চাকুরী দিয়েছেন, ত্রিনাথ জানায় চাকুরী পাওয়ার পর থেকে বড়ভাই লোকনাথ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখেনি এমনকি নিজ গর্ভধারিনী মায়ের সাথেও কথা বলেন না তিনি। আওয়ামী ক্ষমতাবলে নিজের অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলে শ্রী হৃদয় চন্দ্র দাসকেও একই পদে ১নং ওয়ার্ডের চৌকিদার পদে যুক্ত করেছেন, সপ্তাহে একদিন হাজিরা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন সরকারি অর্থ। তিনি নিজেও ৫নং ওয়ার্ডের চৌকিদারের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এছাড়া লোকনাথ এর বিরুদ্ধে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ কার্ড বিতরণে রয়েছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় লোকনাথ চন্দ্র দাস পুরনো একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন। লোকমুখে জানাযায় একই সীমানার সম্মুখ অংশে বিশাল অট্টালিকার মালিক শ্রী লোকনাথ চন্দ্র দাস নিজে। বাড়িটি নির্মান ব্যয় আনুমানিক কোটি টাকা ছাড়িয়ে। যিনি সামান্য বেতন পান, তার স্ত্রী, ছেলে ও নিজে সব মিলে প্রতিমাসে আয় করেন ২০/২১ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারে এই টাকা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন সেখানে কোটি টাকার বাড়ি? এলাকার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন সামান্য বেতন পেয়ে কিভাবে কোটি টাকার সম্পদ করলেন? এছাড়া ছেলে হৃদয় চন্দ্র দাস দামী মটরসাইকেল চালান প্লেট নং- ঢাকা মেট্রো-ল ৬৯-৭৬৫৪ যার মুল্য ৩লাখ টাকার অধিক।
লোকনাথ চন্দ্র দাসের সম্পদ অনুসন্ধানে জানাযায় চাঞ্চল্যকর তথ্য, বিগত বছরগুলোতে লোকনাথ নিজেই ৯টি ওয়ার্ডের হোল্ডিং ট্যাক্স ওঠানোর নামে জালিয়াতির আশ্রয় নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশি টাকা উত্তোলন করে সামান্য পরিমাণ হোল্ডিং ট্যাক্স দেখিয়ে সরকারের কোষাগারে জমা দিতেন, বিভিন্ন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চৌকিদারদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বর্তমান চেয়ারম্যান রিপন মিয়া ২০২৫-২৬ সালে চুক্তিভিত্তিক এনজিও কর্তৃক হোল্ডিং ট্যাক্স উত্তোলন করা হয়েছে তাতে অসম্ভব অর্থ লোপাটের সত্যতা বেরিয়ে আসে। এসব প্রমানের কারণে শ্রী লোকনাথ চন্দ্র দাসের আসল রুপ বেরিয়ে পড়ে।
এব্যপারে লোকনাথ চন্দ্র দাসের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানায় আগে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন এখনো মাঝে মধ্যে করা হয় তাতে বছরে কিছু আয় হয়। তাছাড়া বাড়িটি করতে তাকে দুটি জমি বিক্রি করতে হয়েছে। লোকনাথের এই কথার সত্যতা নিশ্চিত হতে অনুসন্ধানী টিম এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে জানতে পারেন জমি বিক্রির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা তার পিতা আকালী চন্দ্র দাসের ভিটা জমি ছাড়া অন্য কোনো জমি ছিলোনা। সামান্য বেতনে তাদের জীবিকা নির্বাহ হয় তাহলে জমি বাড়ি গাড়ি সম্পদের উৎস কোথায়?
বড়কান্দা ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের হরিদাশ জানায় শ্রী আকালী চন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর লোকনাথ একই স্থলে ২০ বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করছেন প্রতিবছর হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের সময় সাথে থাকলেও বাড়ি প্রতি কত টাকা ওঠানো হয় তা জানতেন না, ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে লোকনাথ নিজ বাড়িতে চলে যেতেন, কোথায় কিভাবে জমা করতেন তার কিছুই জানতেন না তারা। ৭নং ওয়ার্ডের গোসাই জানান প্রতি বছর হোল্ডিং ট্যাক্স ওঠানোর সময় এলে ৫/৬ দিন যাবৎ লোকনাথ এর সাথে সময় দিতে হয় সারাদিনে একবার খাবার ও তিনশ করে খরচ দিতেন, ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে লোকনাথ নিজ বাড়িতে চলে যেতেন বাকিটা কিছুই জানেনা। ৮নং ওয়ার্ডের চৌকিদার হরনাথ জানায় একই কথা, ৬নং ওয়ার্ডের চৌকিদার ছয়দেব তিনিও একই কথা জানান, ২নং ওয়ার্ডের চৌকিদার অর্জুন তিনিও লোকনাথ সম্পর্কে একই কথা বলেন। এছাড়া চৌকিদার পদে নিয়োগ পাওয়া স্বারথী রানী সপ্তাহে একদিন চা বানিয়ে সমপরিমাণ বেতন উত্তোলন করে নিচ্ছেন যা সরকারের অর্থ তছরুপ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।১নং ওয়ার্ডের চৌকিদার লোকনাথ চন্দ্র দাসের ছেলে শ্রী হৃদয় চন্দ্র দাস মাসে চারদিন মাত্র ১ঘন্টা করে সময় দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ যা নিরর্থক। ৮নং ওয়ার্ডে নিয়োগ পাওয়া ত্রিনাথ ৩নং ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করেন তিনি জানান লোকনাথ তার বড় ভাই হলেও দীর্ঘ ১৪ বছর তার সাথে কথা হয়না। ত্রিনাথের ছোট ভাই শ্যামল লেখাপড়া করে নিজের মত জীবন যাপন করে যাচ্ছেন তার সাথেও বড়ভাই লোকনাথের সম্পর্ক নেই। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায় মন্দির থেকেও লোকনাথকে কমিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সে এখন একঘরে তার সাথে হিন্দু পঞ্চায়েতের ওঠাবসা নেই।
শ্রী লোকনাথ চন্দ্র দাস এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য জানতে বড়কান্দা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কিবরিয়া মিয়ার সাথে যোগাযোগ করে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এভাবেই দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে যা অনুসন্ধান ক্রমে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া অতি প্রয়োজন তবেই দুর্নীতি ও অপরাধ মুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।

