
বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো নিয়মিত বদলি। একই জায়গায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হয়—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বদলি নীতিমালা করা হয়েছে। কিন্তু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগে এই নিয়ম যেন দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল না একটি বিশেষ নামের ক্ষেত্রে। তিনি হলেন সদ্য বদলিকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল।
সূত্রের দাবি, ২০০৪ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় রাজধানীর বাইরে তার বদলি হয়নি, অথচ একই সময়ে শত শত প্রকৌশলী দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি হয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—কোন প্রভাব বা কার ছত্রছায়ায় তিনি এত বছর ঢাকায় ছিলেন?
অভিযোগ রয়েছে, চাকরির শুরুতেই এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশে তিনি ঢাকায় পোস্টিং পান। এরপর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। বিশেষ করে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার দায়িত্বে থাকার সময় স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক কর্মকর্তা জানান, তাকে প্রায়ই সচিবালয়ে দেখা যেত, কিন্তু নিজের অফিসে পাওয়া যেত না। সচিবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকার কারণে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ উপেক্ষা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগে তার দায়িত্বকাল ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে টেন্ডার বাণিজ্য ও ভুয়া বিল সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, বহু উন্নয়ন ও মেরামত প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সেই অর্থ প্রকৌশলী ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই যেখানে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা, সেখানে অভিযোগ রয়েছে বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি টাকার টেন্ডার দেখিয়ে কমিশন বাণিজ্য করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ উঠেছে, তিনি ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই কাজ পেতেন। বিনিময়ে দিতে হতো মোটা অঙ্কের কমিশন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও তার বড় ধরনের প্রভাব ছিল। কে কোথায় পোস্টিং পাবেন—এ সিদ্ধান্তেও তার নেটওয়ার্ক কাজ করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে প্রশাসনে। তার মরহুম পিতা অর্ধেন্দু শেখর মন্ডল খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এই পারিবারিক ও দলীয় পরিচয়ের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাকে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ এবং আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। এমনকি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গেও তার নাম আলোচিত হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় আরও আছে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করা হয়েছে। সেখানে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসায় বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন যদি তার ও পরিবারের সম্পদের অনুসন্ধান চালায়, তাহলে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের চিত্র উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি বিভিন্ন মহলে নিজেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। যদিও এ বিষয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং ধারাবাহিক অভিযোগ প্রকাশের পর তাকে অবশেষে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নতুন কর্মস্থলেও তিনি পুরোনো ঠিকাদার ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে যুক্ত রয়েছেন।
এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোন বন্ধ থাকায় তার কোনো প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে বদলি নীতিমালা কার্যত অকার্যকর থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট বলয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এখন দেখার বিষয়—এই অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে কতটা সামনে আসে এবং স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ক্ষেত্রে সত্যিই কি জবাবদিহিতার অধ্যায় শুরু হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472