
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। পুরোনো সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা প্রকাশ্যে দুর্নীতি করে তদন্ত প্রতিবেদনে ধরা পড়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। সেই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নাম হচ্ছে বিআরটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) গোলাম ফারুক। তার বিরুদ্ধে সরাসরি ৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিভিন্ন তদন্তেই উঠে এসেছে। কিন্তু শাস্তির বদলে তিনি পেয়েছেন পদোন্নতি; এমনকি এখনো তিনি বিভিন্ন ডিপো, বাস, কাউন্টার লিজসহ নানা জায়গায় অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে সহযোগিতা করছেন বলেই সংগঠনের অনেক কর্মচারীর দাবি।
বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ডিপোতে বাস মেরামত, যন্ত্রাংশ ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ—এসব কাজে গোলাম ফারুক ও তৎকালীন ম্যানেজার (অপারেশন) নূর-ই-আলম ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিপুল টাকা লোপাট করেছেন। কোথাও অকেজো বাস কেটে বিক্রি করে অর্থ গায়েব করা, কোথাও আবার বিআরটিসির নিজস্ব চালকদের বাদ দিয়ে বাইরের চালকদের দিয়ে বাস চালিয়ে রাজস্ব জমা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, এখনও তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ লিজ বহাল রেখে বা লিজ দেওয়ার নামে নিয়মিত টাকা তুলছেন।
বিআরটিসি কর্মীদের ভাষায়, গোলাম ফারুক নামটি শুনলেই সবার মনে আসে ঘুষ, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার কথা। অনেকে দাবি করেন, আগের সরকার আমলে তিনি ব্যাপকভাবে সুবিধা পেয়েছেন এবং এখনো পূর্ববর্তী প্রভাবশালী মহলের লোকজনকে নানা উপায়ে সহায়তা করে যাচ্ছেন। কোনো ফাইল তার টেবিলে গেলে ঘুষ ছাড়া তা নড়াচড়া করে না—অনেক ভুক্তভোগী পরিবহন ব্যবসায়ী এমন অভিযোগই তুলে ধরেছেন।
তদন্ত নথিতে দেখা যায়, বগুড়া ডিপোতে কর্মরত অবস্থায় তিনি ২ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা রাজস্ব তহবিলে জমা দেননি। আবার অন্য এক তদন্তে উল্লেখ আছে, বাইরের চালকদের দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ১ কোটি ১২ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে তার নেতৃত্বে। মোহাম্মদপুর ডিপোতে দায়িত্ব পালনের সময়ও রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন, জ্বালানি—এসব খাতে অনিয়ম করে ২৮ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি করেছেন বলে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে জানা যায়।
এতসব অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় তদন্ত হলেও কোনো শাস্তি হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে তিনি মামলা খারিজ করে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতিও পেয়েছেন। শাজাহান খানের সময় তিনি বিশেষভাবে প্রভাবশালী ছিলেন—এমন কথাও বহু কর্মকর্তার মুখে শোনা যায়। ফলে এখনো কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পান না।
গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন তিনি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩৫ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করেননি—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে বিআরটিসির বিভিন্ন নথিতে গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে মোট ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
বিআরটিসির কর্মীদের মতে, বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও কোনোভাবে তাকে ঠেকাতে আগ্রহী নন, বরং নিজেও সুবিধাভোগী। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতির মধ্যে আটকে গেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কয়েকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর না হওয়ায় অনেকেই হতাশ।
অনেক কর্মচারী প্রশ্ন তুলছেন—যদি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেও এমন বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সরানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি গোষ্ঠীই আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসবে। আর এর দায় কে নেবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

