নিজস্ব প্রতিবেদক জারা হায়াৎ ঢাকা।
যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় স্কুল গলির কথিত নারী সাংবাদিক
সুইটি সিনহাকে ঘিরে চাঁদাবাজি, ভ্যান আটক ও নানামুখী
অভিযোগ; ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক, প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি
ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার কাজলারপাড় স্কুল গলিতে বসবাসকারী
নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া সুইটি সিনহা নামধারী এক নারীকে
ঘিরে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং
বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি
যাত্রাবাড়ী, কাজলারপাড়, কোনাপাড়া, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকা
থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় গিয়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে
নানা অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলার চেষ্টা করেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সুইটি সিনহা বিভিন্ন সময় নিজেকে কখনো
সাংবাদিক, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, আবার কখনো আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ
ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। “জাতীয় সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা”
নামের একটি গণমাধ্যমের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি
ও অফিসে গিয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে কথিত
অসংগতি বা অনিয়ম তুলে ধরে অপপ্রচারণার ভয় দেখিয়ে মোটা
অঙ্কের অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি বিভিন্ন আইনগত ধারা
উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় প্রশ্ন তোলেন এবং
প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ বা ভিডিও প্রতিবেদন প্রচারের
হুমকি দেন। পরে বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার কথা বলে মোটা অঙ্কের
অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী।
ফলে অনেক ব্যবসায়ী মানসিক চাপ ও সামাজিকভাবে হেয়
প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এদিকে সম্প্রতি একটি নতুন ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে।
জানা গেছে, গত ৪ মার্চ আনুমানিক রাত ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ীর
কাজলারপাড় এলাকায় একটি পণ্যবাহী ভ্যানগাড়ি আটকানোর
ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে
নিয়ে ওই ভ্যানগাড়ি আটকের ঘটনায় সুইটি সিনহা নামধারী
এই নারী মূল ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভ্যানগাড়িটি “অর্গানিক প্রোডাক্ট” নামের
একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বহন করছিল। ভুক্তভোগী
ব্যবসায়ীর দাবি, ঘটনার তিন থেকে চার দিন আগে সুইটি সিনহা
তাদের কারখানায় গিয়ে বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরে মোটা অঙ্কের
অর্থ দাবি করেন। তবে ব্যবসায়ী ওই দাবি করা অর্থ দিতে
অস্বীকৃতি জানান। এর দুই থেকে তিন দিনের মাথায় রাতের বেলা
তাদের একটি পণ্যবাহী ভ্যান কাজলারপাড় এলাকায় আটক করা হয়
এবং ভ্যান থেকে প্রসাধনী পণ্যে ভর্তি কয়েকটি কার্টুন সরিয়ে নেওয়া
হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ এসে ভ্যানটি যাত্রাবাড়ী
থানায় জব্দ করে পাঠায়। তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ,
পরবর্তীতে থানার বাইরে এসে বিষয়টি মীমাংসার নামে ওই নারী
সাংবাদিক এক লক্ষ টাকা দাবি করেন। এ সংক্রান্ত অডিওসহ
কিছু তথ্যপ্রমাণ ইতিমধ্যে গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে দাবি
করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও সম্প্রতি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্বনামধন্য
কনজ্যুমার প্রোডাক্ট ফ্যাক্টরির মালিকের পক্ষ থেকেও অভিযোগ
উঠেছে যে, সুইটি সিনহা তার ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে গিয়ে নানা
অভিযোগ তুলে চাঁদাবাজির স্টাইলে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেন।
ব্যবসায়ী অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে
অপপ্রচারণা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট
ব্যবসায়ী বিষয়টি নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন
বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কিছু প্রতিবেশীর কাছ থেকেও এই নারীকে ঘিরে আরও
বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেশীদের দাবি, বাহ্যিকভাবে নারীর মতো শারীরিক গঠন
থাকলেও তিনি প্রায়ই নিজেকে পুরুষের মতো সাজসজ্জায়
উপস্থাপন করেন এবং বিভিন্ন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার
চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কিছু কুরুচিপূর্ণ
ও সামাজিকভাবে বিতর্কিত আচরণের কথাও স্থানীয়দের
মুখে শোনা গেছে, যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে
যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়াও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, সুইটি সিনহা নামধারী
এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মানব পাচার
এবং পরিকল্পিত ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার
অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে কথিত তথ্য পাওয়া
গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তিনি
অন্যান্য সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে অত্যন্ত নম্র ও কোমল
ভাষায় “বড় ভাই” বা “বড় বোন” বলে পরিচয় দেন এবং
ঘনিষ্ঠতা তৈরি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই স্বার্থসিদ্ধি
বাস্তবায়িত না হলে উল্টো সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই
অভিযোগ ও অপপ্রচার শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পূর্ব দিগন্ত অনলাইন নামের একটি
পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সায়েম ওরফে রাজু নামের
এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তিনি অন্য এক নারী
সাংবাদিককে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়— “আমি এখনই
তোর বাসায় আসতেছি, কেন তুই আমার মতো ক্রাইম রিপোর্ট
করলি না।” এমন আরও অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার কিছু রেকর্ড
গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও “ড্রাগনশেড” নামের একটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের
অফিসে গিয়ে অতর্কিতভাবে এক যুবককে শারীরিকভাবে আঘাত
করার একটি ভিডিও ফুটেজও স্থানীয়দের হাতে এসেছে বলে
দাবি করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার
করতেও দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি ভিডিওতে
তিনি বিএনপির এক শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে নিজের আত্মীয়
(ফুপা) বলে দাবি করেছেন বলেও জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে
যদি কেউ ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক অর্থ আদায় বা চাঁদা
দাবি করে, তবে তা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৮৪, ৩৮৫ ও ৩৮৬
ধারার আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এছাড়া প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বেআইনি হস্তক্ষেপের
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির
৪২০সহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া
সম্ভব বলে মত দিয়েছেন আইনবিদরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন— এত অভিযোগ,
ভিডিও ও অডিও সামনে আসার পরও কেন এখনো তার বিরুদ্ধে
সুস্পষ্ট আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তারা মনে করেন,
সাংবাদিকতার মতো সম্মানিত পেশার আড়ালে কেউ যদি
ব্যক্তিগত স্বার্থে ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা
সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে তা শুধু আইনগত অপরাধই নয় বরং
পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনার
নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগের
সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর
আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472