আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই প্রযুক্তিটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ‘বড় ধরনের ঝুঁকি’ তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড হুইটল।
তার মতে, এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তার আড়ালে অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু ঝুঁকি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এআইনির্ভর হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির খরচ বেড়ে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বক্তব্যে অধ্যাপক হুইটল বলেন, এআই নিয়ে চলমান উন্মাদনার আড়ালে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
এআইয়ের ওপর বাড়ছে ব্যবসার নির্ভরতা
অধ্যাপক হুইটলের মতে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে এআইকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করেছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু এআই টুল ও সেবার ওপর তাদের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
এই নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। কারণ, এআই সেবার দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত কয়েক বছরে গড়ে ওঠা নতুন স্টার্টআপগুলোর কতগুলো এআই সেবার দাম পাঁচ গুণ বা ১০ গুণ বেড়ে গেলে টিকে থাকতে পারবে?
অধ্যাপকের মতে, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি একেবারেই অবাস্তব নয়। ফলে এআইনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে বর্তমান কম খরচ ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে—এমন ধারণা করা বিপজ্জনক।
মানুষকে সরিয়ে এআই নির্ভরতার ঝুঁকি
এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার আরেকটি দিক হলো শ্রমবাজার। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীসংখ্যা কমিয়ে এআইয়ের মাধ্যমে কাজ করানোর পরিকল্পনা করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে ব্যয় কমতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক হুইটল বলেন, কোনও প্রতিষ্ঠান যদি মানুষের পরিবর্তে এআইকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ বাদ দিয়ে দেয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে এআইয়ের দাম যতই বাড়ুক না কেন, প্রতিষ্ঠানটিকে সেই খরচ বহন করতেই হবে।
অর্থাৎ, একবার মানবশ্রমের পরিবর্তে কোনও ব্যবসা এআইনির্ভর কাঠামো গড়ে তুললে সহজে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মূল্য নির্ধারণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
‘খরচ কমানোর সংস্কৃতি’ নিয়ে প্রশ্ন
অধ্যাপক হুইটলের মতে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে এক ধরনের ‘খরচ কমানোর সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে। অনেক ব্যবসা এআইকে মূলত ব্যয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এআই ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন মূল্য তৈরি হচ্ছে কি না, কিংবা নতুন কোনও উৎপাদনশীলতা বা অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা কতটা তৈরি হচ্ছে—সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, শুধু কর্মী কমানো বা পরিচালন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে এআইয়ের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিচার করা উচিত নয়। বরং প্রযুক্তিটি নতুন পণ্য, নতুন সেবা, নতুন বাজার কিংবা নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি সাশ্রয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আহ্বান
অধ্যাপক হুইটল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই নিয়ে অতিরিক্ত আকর্ষণ ও উচ্ছ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত হিসাব করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, এআইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বর্তমানে স্বল্পমেয়াদে খরচ কমানোর সুযোগ। কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনার সঙ্গে এই প্রযুক্তি কীভাবে যুক্ত হবে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবসাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, এআইকে কেবল দ্রুত খরচ কমানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে ভবিষ্যতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক অর্থনীতি উভয়ই সমস্যায় পড়তে পারে।
এআইয়ের সম্ভাবনা বনাম অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে এআইকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন শিল্প তৈরি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এর দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং ব্যবসায়িক কাঠামোর দুর্বলতার মতো ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
রিচার্ড হুইটলের সতর্কবার্তার মূল বিষয় হলো—এআইয়ের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সুফলের দিকে তাকিয়ে বর্তমান ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান এখন এআইকে তাদের ব্যবসার অপরিহার্য অংশ বানিয়ে ফেলছে, তাদের মূল্যবৃদ্ধি, প্রযুক্তি সরবরাহে পরিবর্তন কিংবা এআই ব্যবহারের নতুন বিধিনিষেধের মতো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তাই এআই নিয়ে শুধু ‘কত দ্রুত এটি আরও শক্তিশালী হবে’—এই প্রশ্ন নয়, বরং ‘এআইয়ের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতা কতটা নিরাপদ এবং টেকসই?’—এই প্রশ্নটিও এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
অধ্যাপক হুইটলের মতে, এআই সত্যিই অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করতে পারে কি না, সেটি প্রমাণের জন্য সময় প্রয়োজন। তার আগে কেবল স্বল্পমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয়ের আশায় পুরো ব্যবসায়িক কাঠামোকে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472