
বিশেষ প্রতিবেদকঃ যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। অনুসন্ধানী সূত্রগুলোর দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিলেন। তার সিন্ডিকেটের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যান হেলাল উদ্দিন। ১২ ডিসেম্বর ভোর রাতে চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জে তার বাসায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান চালানোর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।
সূত্র জানায়, আত্মগোপনে থেকেই হেলাল উদ্দিন বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গোপনে কানাডা যাওয়ার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। এরই অংশ হিসেবে যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে তার প্রাপ্য সব টাকা উত্তোলনের দায়িত্ব নিজের ছোট ভাই জালাল উদ্দিন বাদলের হাতে তুলে দেন। ১৭ ডিসেম্বর, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ঠিক আগের দিন, হেলাল উদ্দিনের অনুপস্থিতিতে তার ভাইয়ের নামে সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একটি অনুমোদন নেওয়া হয়। সে সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদুল ইসলাম সেই আবেদন অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর ফলে শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিল, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ হেলাল উদ্দিনের বিপুল অঙ্কের পাওনা অর্থ তার ভাই গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে। তবে যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নতুন এমডি মো. আমির মাসুদ এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তা বাতিল করতে পারেন।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, শুধু চাকরিজীবনের পাওনাই নয়—হেলাল উদ্দিন তার নামে-বেনামে থাকা শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি ও দেখভালের দায়িত্বও ছোট ভাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ ও দেনদরবার চলছে, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়তে পারেন।
হেলাল উদ্দিনের ছেলে ও মেয়ে আগে থেকেই কানাডায় অবস্থান করছে এবং সেখানে তার একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে, চাকরি জীবনের শেষ দিকে তিনি ও তার স্ত্রী বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন। চট্টগ্রামের একাধিক ব্যাংকে তাদের নামে থাকা এসব হিসাব থেকে তোলা অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই অর্থের একটি অংশ ভারতে অবস্থানরত তার আত্মীয় সাবেক এমপি ও যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং কানাডাপ্রবাসী সন্তানদের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে হেলাল উদ্দিন, মুহাম্মদ এয়াকুব ও তেল টুটুলের নেতৃত্বে যমুনা অয়েলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ আছে, হাজার হাজার কোটি টাকার তেল আত্মসাতের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। শুধু হেলাল উদ্দিনই চাকরি জীবনে অন্তত পাঁচশ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানে নেমেছে বলেও জানা গেছে, যদিও তাকে প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হেলাল উদ্দিন যমুনা অয়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিংগুলোতেই ছিলেন। ১৯৯৫ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পর ১৯৯৭ সালে তার চাকরি স্থায়ী হয়। পতেঙ্গা টার্মিনাল অফিস ও আগ্রাবাদ প্রধান কার্যালয়—এই দুই জায়গাতেই মূলত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। একবার বগুড়ায় বদলির আদেশ হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা বাতিল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনেও তার বিলাসবহুল সম্পদের তালিকা দীর্ঘ। চট্টগ্রামে একাধিক বহুতল ভবন, রাউজানে নিজ গ্রামে পাঁচ ভাইয়ের জন্য আলাদা বাড়ি নির্মাণ, প্রিমিও মডেলের ব্যক্তিগত গাড়ি ও স্ত্রীর জন্য বিলাসবহুল জিপ—সব মিলিয়ে তার জীবনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় অংশই তেল চুরি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে গড়ে তোলা।
সব মিলিয়ে, হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়। তদন্ত সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপই এখন দেখার অপেক্ষা।

