
বিশেষ প্রতিবেদকঃ সাম্প্রতিক সময়ে পিডি ইনামুল কবীরকে ঘিরে জলবায়ু ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। এসব অভিযোগের জবাবে সংশ্লিষ্ট সংবাদে প্রতিবাদ না জানিয়ে তিনি ভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন আকারে একটি লিখিত প্রতিবাদ প্রকাশ করেন, যা প্রতিবেদকের নজরে আসে। সেই প্রতিবাদে তিনি অভিযোগগুলোকে “মিথ্যা” বলে দাবি করলেও, তার বক্তব্যে উঠে আসা কিছু তথ্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবাদে পিডি ইনামুল কবীর জানান, ২৪৬১ কোটি টাকার জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ২৫৫ জন আউটসোর্সিং স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী বুয়েটের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র তার দপ্তরে সংরক্ষিত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা আয়োজনের জন্য যে বড় অঙ্কের ব্যয় হয়, সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ২৫৫ জন নিয়োগের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে আত্মীয়করণ ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রায় ৮০ শতাংশ জনবল এভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যে, নিয়োগের দায়িত্বে দেখানো জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলকেএসএস নামে বাস্তবে বৈধভাবে কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব স্পষ্ট নয়। নিয়ম অনুযায়ী জনবল সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধের অভিজ্ঞতা থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা পূর্ণ হয়নি।
এছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়েছে, তাদের নিবন্ধিত নাম এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার হলেও টেন্ডার দাখিল করা হয়েছে ভিন্ন সংক্ষিপ্ত নামে। একই নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—এই প্রতিষ্ঠানের একক মালিক হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের নাম পাওয়া যায়, যিনি এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) এবং বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একই সঙ্গে ফার্মের মালিক, সিডিউল বিক্রেতা এবং নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা স্বার্থের সুস্পষ্ট সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।
পিডি ইনামুল কবীর তার প্রতিবাদে দাবি করেন, গত দুই বছরে প্রকল্পের জনবল বেতন ও অন্যান্য খাতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঙ্কে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সুযোগ নেই। তবে অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে—প্রত্যেক নিয়োগপ্রাপ্তের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, মোট কত অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় গেছে, এসব বিষয় এখনো অস্বচ্ছ রয়ে গেছে।
অফিস ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রতিবাদে বলা হয়, ৮০ থেকে ৯০ জন জনবলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনুমতি নিয়ে শেওড়াপাড়ায় আলাদা অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এলজিইডির একাধিক সিনিয়র প্রকৌশলীর দাবি, মূল ভবনের চতুর্থ তলায় পর্যাপ্ত খালি জায়গা রয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী পিডি ও হিসাব শাখার অফিস মূল ভবনের মধ্যেই থাকার কথা। নিয়ম অনুসরণ না করে ব্যয়বহুল ও অতিরিক্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত অফিস স্থাপন করায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা সরকারি নথি অনুযায়ী, কাজ না করেই বিল পরিশোধ, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে ২৮ অক্টোবর উপসচিব মোহাম্মদ শামীম বেপারীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে গুরুতর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে ইনামুল কবীরের বিরুদ্ধে সিলেট এলজিইডি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অব.) কাজী আব্দুস সামাদ লিখিতভাবে তদন্তের সুপারিশ করেন।
এছাড়া এলজিইডি সিলেট অফিস কম্পাউন্ডে অবৈধভাবে জীবিত গাছ কাটার অভিযোগে সিলেট বন বিভাগের পক্ষ থেকেও একাধিক চিঠির মাধ্যমে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এসব চিঠির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের দপ্তরগুলোতেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত প্রতিবাদের পর এলজিইডি ভবনে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, লিখিত প্রতিবাদে যেসব দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে নথি ও অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472