
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের আকাশে প্রকাণ্ড একটি উল্কাখণ্ড বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর প্রায় ৩০০ টন টিএনটি বিস্ফোরকের সমপরিমাণ প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন করে সশব্দে বিস্ফোরিত হয়েছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এই বিরল মহাকাশীয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
আনুমানিক ৩ মিটার চওড়া এই মহাজাগতিক পাথরটি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর বাতাসের তীব্র ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে এবং একটি বিশাল আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড শব্দ বা ‘সনিক বুম’ পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
শনিবার (৩০ মে) মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ০৬ মিনিটে নিউ ইংল্যান্ড এবং ম্যাসাচুসেটসের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আকাশে এই তীব্র আলোর ঝলকানি ও বিস্ফোরণটি ঘটে। বিশেষ করে বোস্টন শহরের বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিস্ফোরণের অসংখ্য বিবরণ প্রকাশ করেছেন।
অনেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সেটির কম্পনে তাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। বিজ্ঞানীরা মূলত বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ শনাক্ত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি উন্নত সেন্সর ব্যবহার করে এই ধরনের মহাজাগতিক ঘটনা ট্র্যাক করে থাকেন। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক মাইল উঁচুতে ঘটায় নিচে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
মহাকাশ সংস্থার ডেপুটি নিউজ চিফ জেনিফার ডুরেন ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, এই উল্কাটি বর্তমানে সক্রিয় থাকা কোনো সাধারণ উল্কাবৃষ্টির অংশ ছিল না, বরং এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক বস্তু ছিল। তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি মানবসৃষ্ট কোনো মহাকাশ বর্জ্য বা কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ ছিল না।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ শিলাটি যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ মাইল উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়, তখন সেটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৭৫ হাজার মাইল বা ১ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। বায়ুমণ্ডলে এই আকস্মিক ভেঙে যাওয়ার সময় যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়েছিল তা প্রায় ৩০০ টন টিএনটি-র সমান, যা মূলত এই ভয়াবহ শব্দের সৃষ্টি করেছে।
আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির ফায়ারবল প্রোগ্রাম মনিটর রবার্ট লুনসফোর্ড মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে জানিয়েছেন, দেলাওয়ার থেকে মন্ট্রিয়ল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তারা এই দ্বি-স্তরের বিস্ফোরণের শব্দের ডজন খানেক সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন পেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এটি স্বাভাবিক উল্কার চেয়ে আকারে বেশ বড় ছিল।
পাথরটির গতিপথ ও গতিবেগ বিশ্লেষণ করে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এর বেশিরভাগ অংশই মাটিতে পড়ার আগে সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আর যদি কোনো অংশ অবশিষ্ঠ থেকে থাকে তবে তা সোজা আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। নোয়া-এর অত্যাধুনিক ‘গোয়েস-১৯’ স্যাটেলাইটও এই অদ্ভুত আলোর ঝলকানি নিখুঁতভাবে ক্যামেরাবন্দী করেছে, যা কোনো বজ্রঝড়ের আলো ছিল না।
মহাকাশ বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ নিক স্টুয়ার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, বোস্টনের আকাশে অনাকাঙ্ক্ষিত এই আলোর ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি একটি অতি শক্তিশালী বোলিড বা উল্কার পুনঃপ্রবেশের ঘটনা ছিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা আরও স্পষ্ট করেছে, সাধারণত ভূগর্ভের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটা ভূমিকম্পের চেয়ে এই আকাশীয় সনিক বুমের ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ এটি বায়ুমণ্ডলের একটি সরল রৈখিক পথ ধরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
নাসা স্পেস অ্যালার্টের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, নিউ ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য মানুষ এই বিরল মহাজাগতিক আলোর ঝলকানি ও তীব্র বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী হয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি

