
প্রকৃতির ভয়াল থাবায় ফের তছনছ হিমালয়ের কোলে গড়ে ওঠা দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল। দেশটির রসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় ভোটে কোশি এবং ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ প্লাবনে তৈরি হয়েছে এক মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়। কেবল আবহাওয়ার কোনো সাময়িক পরিবর্তনের কারণে এই ভয়াবহ বন্যা নয় বরং কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা ভূ-প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল এক চক্রের বলি হয়েছে দেশটি।
গত বছরের জুলাইয়ের স্মৃতি ফিরিয়ে ঠিক ১৩ মাসের মাথায় আবারও ভেসে গেছে এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটি। আন্তর্জাতিক সীমা পেরিয়ে তিব্বত থেকে নেমে আসা প্লাবনের তোড়ে রসুয়াগাড়িতে চীন-নেপাল ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে গেছে এবং দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি চার শতাধিক মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ চরম ব্যাহত হচ্ছে, যা হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত তিব্বত সীমান্তে জমে থাকা ক্ষণস্থায়ী বা অস্থিতিশীল হিমবাহিক হ্রদ ভেঙে গিয়ে বা হিমবাহে ধস নেমে এই বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে। নেপাল সরকারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো শক্তিশালী ভূ-কম্পন বা পাহাড়ি ভূমিধসের কারণে একটি প্রধান নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সাময়িকভাবে রুদ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ পানি সেই বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে, যাকে বিজ্ঞানীরা অভিহিত করছেন ‘ইনল্যান্ড সুনামি’ হিসেবে।
নদীমাতৃক এই সরু উপত্যকায় পানির উচ্চতা এবং বেগ এতই বেশি ছিল যে তীরবর্তী লোকালয়, শুকনো বন্দর, কাস্টমস অফিস এবং অসংখ্য অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হিমালয় অঞ্চলের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার কারণে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হাজার হাজার বিপজ্জনক হিমবাহিক হ্রদ তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত নাজুক এই হ্রদগুলো যেকোনো ছোটখাটো ভূ-কম্পন বা ভূমিধসে ভেঙে পড়ে তলদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভাসিয়ে নিতে পারে।
এই সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পেছনে পরিবেশগত ঝুঁকির পাশাপাশি ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত গতিশীলতা এবং মানবসৃষ্ট অপরিকল্পিত উন্নয়নকেও সমানভাবে দায়ী করছেন ভূ-বিজ্ঞানীরা। নেপাল একটি অত্যন্ত সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় প্রতি বছর ভূ-ভাগ কয়েক মিলিমিটার করে ওপরে উঠছে, যার ফলে এখানকার পাহাড় ও মাটির বাঁধন অত্যন্ত দুর্বল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত বাণিজ্য জোরদার করতে নদীর তীরবর্তী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ নিচু অঞ্চলে অবাধ নির্মাণকাজ এবং বেশ কয়েকটি হাইড্রোইলেক্ট্রিক বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন।
নদীর গতিপথ আটকে অবকাঠামো তৈরির ফলে পানির ধাক্কায় ধ্বংসস্তূপের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে গেছে, এমনকি এই একক দুর্ঘটনায় দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিব্বতের হিমবাহ অঞ্চল নিয়ে চীনের সাথে দ্রুত ও সমন্বিত আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থা না থাকায় বারবার একই ধরনের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। নেপালের পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করে এই জলচ্ছ্বাস এখন ভারতের সমতল ভূমির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি চিরস্থায়ী প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা।

