
বিশেষ প্রতিবেদকঃ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্প “মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প” নিয়ে সম্প্রতি বড় ধরনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির পরিচালক মোঃ তবিবুর রহমান তালুকদারকে ঘিরেই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন সূত্রের দাবি—প্রকল্পের বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব, কাজের মান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি সব দিক থেকেই গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। সূত্রের দাবি, তবিবুর রহমান ঘুষের মাধ্যমে এলজিআরডি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার বিশেষ সহকারী মাহফুজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিজের সুবিধা নেন।
তবিবুর রহমানের জীবন শুরু হয়েছিল সিরাজগঞ্জের এক দরিদ্র পরিবার থেকে। ছোটবেলায় তাঁর ডাকনাম ছিল “শুক্কুর”। পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় এলাকাবাসী তাঁকে সহযোগিতা করত। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি, এসএসসি–এইচএসসিতে ভালো ফল এবং পরে বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া—সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল উজ্জ্বল। এরপর তিনি ডিপিএইচইতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান এবং ধীরে ধীরে উচ্চপদে পৌঁছান।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—চাকরির শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার কারচুপি, ঘুষ লেনদেন ও নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় পোস্টিং থাকার সময়ে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় বাড়ি–ফ্ল্যাট কেনেন এবং নিজ এলাকায় কিনেন একশ্রেণীর জমি। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রায় ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে তবিবুর রহমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—এই পদে আসার পেছনেও নানারকম যোগসাজশ ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু সূত্র বলছে, সেই সময়ের এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং তাঁর এপিএস জাহিদ চৌধুরীর মাধ্যমে পদ পেতে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য এখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত নয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মনিটরিং কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অগ্রগতি এখনো মাত্র ৪৬ শতাংশ, অথচ শেষ হতে বাকি আর দেড় মাস। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি কাজই অসম্পূর্ণ। মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট বলছে—অনেক টয়লেট ব্যবহারযোগ্য নয়, কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট দূরে হওয়ায় কাজে লাগছে না, আর পাইপ লাইনের জন্য ব্যবহৃত বেশিরভাগ পাইপই নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ৩০ জেলার ৯৮টি উপজেলায় কাজ হলেও অভিযোগ—মানের দিক থেকে বেশিরভাগই ত্রুটিপূর্ণ।
সূত্র জানায় টেন্ডার মেনিপুলেশন, ঠিকাদারের সাথে ১০-২০% চুক্তিতে কার্যাদেশ, নিম্নমানের কাজে ঘুষ নিয়ে বিল প্রদান, প্রকল্পের কেনাকাটায় ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে টাকা আত্মসাৎ, আউটসোর্সিং নিয়োগে ঘুষ, কনসালটেন্ট ফার্ম নিয়োগে মোটা অংকের ঘুষ। সূত্র আরো জানায় এই প্রকল্পে নানান ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক মোঃ তবিবুর রহমান কামিয়েছেন প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সূত্র জানায় প্রকল্পের শেষ দিকে এই দুর্নীতির মাত্রা আরো বেড়ে যাবে।
টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ঠিকাদার নিয়োগ, ভুয়া বিল–ভাউচার, নিম্নমানের কাজের বিল অনুমোদন—সবকিছুতেই অনিয়ম থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এসব মাধ্যমে তবিবুর রহমান নাকি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন—যা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রকল্প দপ্তরের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে।
তবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও নানা আলোচনা আছে অফিসে ও এলাকায়। সহকর্মীদের অনেকেই তাঁকে ডাকেন “বিয়ে পাগলা তবিবুর” নামে। অভিযোগ আছে—তিনি যেখানেই পোস্টিং পেতেন, সেখানে বিয়ে করতেন। তাঁর বিবাহ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গুঞ্জন রয়েছে, এবং সূত্রের দাবি—এখন পর্যন্ত তাঁর কমপক্ষে চারটি বিয়ের খোঁজ মিলেছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি সাধারণত অফিসের কম আয়ের কর্মচারী বা এলাকার স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে বিয়ে করতেন, পরে তাঁদের নানা সুবিধা দিয়ে সাবলম্বী করে দিতেন। এছাড়া ঢাকাতেও নাকি তাঁর দুই স্ত্রী আলাদা দুই ফ্ল্যাটে থাকেন।
সবকিছুর মধ্যেই সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—প্রকল্পের টাকার অপচয়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজ। সূত্রের দাবি—প্রকল্পের শেষ দিকেই এসব অনিয়ম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকটাই এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণীকরণ বাকি।

