
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রপ্তানি না করেই কাগজে-কলমে পণ্য পাঠানোর গল্প তৈরি করে সাড়ে ১৮ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং ও আরও ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার রপ্তানি প্রণোদনা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মোট ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তাও রয়েছেন। দুদকের উপপরিচালক মো. আহসান উদ্দিন ঢাকায় সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান দো এম্পেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. জিয়া হায়দার মিঠু এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলোক সেনগুপ্তকে। তাদের সহায়তা করেন বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট — কেএইচএল এক্সাম লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম রাসেল, এ কে এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কাসেম খান, প্যান বেঙ্গল এজেন্সিস লিমিটেডের এমডি মো. সেলিম। আরও জড়িত ছিলেন জি আর ট্রেডিং করপোরেশন সি অ্যান্ড লিমিটেডের পরিচালক বেগম রাসিদা পারভীন রুনু, এ অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আলতাফ হোসেন ও মো. আব্দুল জলিল আকন।
এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি অডিট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ পাওয়া গেছে। দুদকের মামলায় নাম আছে— এ কাসেম অ্যান্ড কো.-এর মালিক মোহাম্মদ মোতালেব হোসেন ও জিয়াউর রহমান জিয়া, এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারের দায়িত্বে থাকা জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস, মুহাম্মদ সাজিদুল হক তালুকদার, নাসির উদ্দিন আহমেদ।
সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল কাস্টমস বিভাগের কিছু কর্মকর্তার। মামলায় থাকছে ১১ জনের নাম— সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর কবির, মবিন উল ইসলাম, সাবেক সহকারী কমিশনার জয়নাল আবেদীন, রাজস্ব কর্মকর্তা জমির হোসেন, এ এইচ এম নজরুল ইসলাম, আমির হোসেন সরকার, গৌরাঙ্গ চন্দ্র চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন সরকার, মো. মঞ্জুরুল হক, সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার ও বাসুদেব পালক। একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের এক্সপোর্ট বিভাগের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আনোয়ার জাহানকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা মিলেমিশে আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রপ্তানি হয়েছে—এমন নথি তৈরি করে ব্যাংকে টাকা আনার ব্যবস্থা করে। এভাবে দো এম্পেক্স লিমিটেডের নামে দেশে এসেছে ২২ লাখ ১৮ হাজার ১৭.৪৪ মার্কিন ডলার, যার বাংলাদেশি মূল্য ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। অথচ এসব রপ্তানির বেশিরভাগই ছিল ভুয়া—ব্যবহার করা হয়েছিল শুধু কাগুজে চালান।
২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪১টি বিল অব এক্সপোর্ট জমা দেয়। এর মধ্যে মাত্র ৭টির রপ্তানির সত্যতা পাওয়া গেলেও বাকি ৩৪টি চালান সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। কিন্তু এই ভুয়া রপ্তানির ওপর ভিত্তি করেই তারা সরকার থেকে প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার নগদ প্রণোদনা তুলে নেয় এবং আত্মসাৎ করে।
দুদকের মতে, রপ্তানি না করেই রপ্তানি হয়েছে এমন নথি বানিয়ে ব্যাংক ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহায়তায় বিদেশ থেকে টাকা আনা এবং সরকারি প্রণোদনা নেওয়া—এটাই ছিল পুরো চক্রের মূল কৌশল। এই প্রতারণার মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে।

