
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বর্তমানে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নানা সূত্রে জানা গেছে, বিটিভির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সংগঠিতভাবে কোটি কোটি টাকা লুটপাট, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পরিচালক (অর্থ) মোঃ জহিরুল ইসলাম মিয়া, পরিচালক (পরিকল্পনা ও অনুষ্ঠান) মোঃ আজগর আলী এবং সহকারী পরিচালক নাজিম উদ্দিন।
অভিযোগে বলা হচ্ছে, প্রায় ৭৮ বছর বয়সী ডিজি ও অন্যান্য কর্মকর্তাকে উপেক্ষা করে আজগর আলী পুরো প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছেন। ২০১৩ সালে কন্ট্রোলার পদে যোগ দেওয়ার পর অস্বাভাবিক গতিতে পদোন্নতি পেয়ে ২০২৫ সালের ২ আগস্ট তিনি পরিচালক (পরিকল্পনা) পদে বসেন। তার এই অস্বাভাবিক উত্থানের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধু ও উপসচিব ইব্রাহিম মিনির প্রভাব থাকার কথাও বলা হচ্ছে।
বিটিভির আলোচিত আরেক নাম নুর আনোয়ার হোসেন রঞ্জু। সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদের নির্দেশে তিনি বিরাট অঙ্কের অর্থ লুট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে বিটিভির ১৪ কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সিন্ডিকেটের সদস্যরা—জহিরুল ইসলাম মিয়া, আজগর আলী ও নাজিম উদ্দিন—তার অনিয়ম আড়াল করতে প্রশাসনকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার সংক্রান্ত দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বিটিভির এটি বিনামূল্যে সম্প্রচার করার কথা থাকলেও পরিচালক (অর্থ) জহিরুল ইসলাম মিয়া পরিকল্পিতভাবে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয় “খেলায় জয়” হিসেবে দেখিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়নি, সরকারি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমে গেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও সিন্ডিকেটের প্রভাব স্পষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি নিয়োগে প্রার্থীপ্রতি ১৫–২৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। জহিরুল ইসলাম মিয়া, আজগর আলী ও উপসচিব ইব্রাহিম নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে নিয়োগ বোর্ড এবং টেন্ডার কমিটিকে প্রভাবিত করছেন। এর মাধ্যমে পদোন্নতি, বদলি ও আর্থিক লেনদেনে তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া ‘দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন (১ম পর্ব)’ এবং ‘বিটিভি কেন্দ্রীয় সম্প্রচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন’ প্রকল্পেও প্রায় ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এসেছে। যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে কমিশনভিত্তিক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভ্যন্তরীণ অডিট, অর্থ বিভাগ, অনুষ্ঠান শাখা ও প্রকল্পগুলোতে চলমান অনিয়মের পরও কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি। ফলে বিটিভির সাধারণ কর্মকর্তারা আতঙ্কে কর্মজীবন চালাচ্ছেন। সিন্ডিকেটের দীর্ঘদিনের দাপটে সরকারি গণমাধ্যমের সুনাম, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কেউ মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

