
বিশেষ প্রতিবেদকঃ কক্সবাজারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পদ কম দামে বিক্রি ও দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী কর্মকর্তা চক্র নদী, বন্দর, ড্রেজিং ও ইজারা কার্যক্রমকে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম করেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম (সিআইপি) দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর। অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরে বেরিয়ে আসতে থাকে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দির সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে কোটি কোটি ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্য। সরকারি সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এত বিশাল পরিমাণ বালু ও মাটি উত্তোলনের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট এলাকায় জেলা প্রশাসনের যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও যাচাই শুরু করেছেন।
এদিকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময়ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। অভিযানে ড্রেজিং করা বালু ও মাটি বিক্রির আড়ালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তি সম্পাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নিশ্চিত করতেই পুরো কাজটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু কক্সবাজার নয়, এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকার তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদী এলাকাতেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ইজারা বাণিজ্য এবং রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এই চক্র দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল।
পুরো ঘটনার তদন্তে দুদক একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে গঠিত এই টিম ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। তদন্ত শেষ হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় যে চিত্র সামনে আসছে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেটের বড় উদাহরণ। সরকারি সম্পদ লুট, টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে একটি চক্র কোটি কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে, সেটিই এখন তদন্তে উঠে আসছে। এখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে সত্যিই কি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত সবকিছু আগের মতোই চাপা পড়ে যাবে।

