
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোর একটি বাসকে কেন্দ্র করে মেরামত ব্যয়, যন্ত্রাংশের হিসাব, ইনভেন্টরি এবং বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত নথিপত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠছে—একই বাসের মেরামতের জন্য এক পর্যায়ে যেখানে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল মাত্র ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকা, পরবর্তী সময়ে সেই ব্যয় কীভাবে বেড়ে দাঁড়াল ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকায় ? দুই প্রাক্কলনের ব্যবধান প্রায় ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৭৫ টাকা। অর্থাৎ পরবর্তী প্রাক্কলনটি আগের তুলনায় প্রায় ৮.৪ গুণ বেশি। এই অস্বাভাবিক ব্যবধানই এখন পুরো মেরামত প্রক্রিয়াকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—ডিপোতে বাসটি অবস্থানকালে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে ফেলা, নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজনের নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং কিছু যন্ত্রাংশের অস্তিত্ব না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়, তবে বিদ্যমান নথি, প্রাক্কলন ও ইনভেন্টরি পাশাপাশি রাখলে তদন্তের যথেষ্ট কারণ স্পষ্ট হয়।
একই বাস, দুই প্রাক্কলন—ব্যয়ের ব্যবধান ২৮ লাখের বেশি : প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, আলোচিত বাসটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর হিসেবে ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৫৪৯৯ উল্লেখ রয়েছে। প্রস্তুতকাল ২০১১ এবং চালুর তারিখ ৫ অক্টোবর ২০১১ বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে উল্লেখ আছে।
নথিতে বাসটির ইঞ্জিন, এসি সিস্টেম, গিয়ারবক্স, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, বডি ও ছাদসহ একাধিক অংশে ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি অকেজো ঘোষণাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাসটি দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং স্থানীয় বাজারে যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হওয়ায় মেরামত আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না।

কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী পর্যায়ে বাসটির মেরামতের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩,৮৫,৭২৫ টাকা। সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঙ্গে স্মারক/চিঠি নং ৩১২, তারিখ, ১০/০৩/২০২৪-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৫/১২/২০২৫ তারিখের প্রাক্কলনে একই বাসের মেরামত ব্যয় দেখানো হয় ৩২,৪৭,২০০ টাকা। অর্থাৎ দুই প্রাক্কলনের মধ্যে পার্থক্য— ৩২,৪৭,২০০ – ৩,৮৫,৭২৫ = ২৮,৬১,৪৭৫ টাকা। শুধু ব্যয়ের অঙ্ক নয়, এই বিপুল পরিবর্তনের পেছনে কী কী নতুন কাজ, যন্ত্রাংশ ও শ্রম ব্যয় যুক্ত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
‘অকেজো’ ঘোষণার নথিতেই আবার ৩২ লাখ টাকার মেরামত! : নথির আরেকটি অংশ আরও গুরুত্বপূর্ণ। মোটরযান অকেজো ঘোষণার জন্য প্রস্তুতকৃত বিবরণীতে বাসটির ইঞ্জিন, এসি সিস্টেম ও গিয়ারবক্স অকেজো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বডি, ছাদসহ বিভিন্ন অংশের মেরামতের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। সেখানে বাসটির প্রান্তীয় উৎস/ক্রয়মূল্য ৩২,৪৭,২০০ টাকা-সংক্রান্ত একটি অঙ্কও দেখা যায়। পাশাপাশি মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয় এবং মেরামত-পরবর্তী মূল্য নিয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কমিটির পরিদর্শনসংক্রান্ত নথিতে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বর্তমান অবস্থা, আনুমানিক মূল্য এবং মেরামত ব্যয়ের আলাদা হিসাব সংযোজন করা হয়েছে। সেখানে ইঞ্জিন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ট্রান্সমিশন, সাসপেনশন, ব্রেক, টায়ার, বডি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের একাধিক আইটেমের বিপরীতে মূল্য ও মেরামত ব্যয়ের অঙ্ক রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একই বাসের জন্য কোন অঙ্কটি প্রকৃত ক্রয়মূল্য, কোনটি মেরামত ব্যয় এবং কোনটি বর্তমান/সংরক্ষিত মূল্য—তা নথিতে স্পষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
নথির OCR/অনুলিপিতে কয়েকটি অঙ্ক ও শব্দ বিকৃত হওয়ায় মূল স্বাক্ষরিত কপি যাচাই না করে কোনো একটি অঙ্ককে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। তবে এই অস্পষ্টতাই বরং মূল নথি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যন্ত্রাংশ খুলে ফেলার অভিযোগ—কোথায় গেল সেগুলো ? অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো বাসটি ডিপোতে অবস্থানকালে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে ফেলার দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী ইনভেন্টরিতে যে যন্ত্রাংশগুলো বাসে থাকার কথা ছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোর কিছু আর পাওয়া যায়নি। আবার নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজনের নামে বিল-ভাউচার প্রস্তুতের অভিযোগও উঠেছে।
এখানে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন—
পুরোনো যন্ত্রাংশগুলো কোথায় গেল ? সেগুলো খুলে নেওয়ার কোনো অনুমোদন ছিল কি না ? খোলা যন্ত্রাংশের জব্দ/স্টোর রেজিস্টার রয়েছে কি ?
স্ক্র্যাপ হিসেবে দেখানো হলে নিলাম বা নিষ্পত্তির কোনো নথি আছে কি ? নতুন যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ, চালান, সরবরাহকারী, গ্রহণ কমিটি ও স্টোর রিসিভিং রিপোর্ট কোথায় ? বাসে বাস্তবে যেসব যন্ত্রাংশ লাগানো হয়েছে, সেগুলোর সিরিয়াল নম্বর বা প্রস্তুতকারকের তথ্য কি যাচাই করা হয়েছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে—এটি নিছক হিসাবগত ভুল, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনো আর্থিক অনিয়ম রয়েছে।
৩২ লাখ টাকার মেরামত—বাসের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে কি সামঞ্জস্যপূর্ণ ?
পরিদর্শন কমিটির নথিতে বাসটির বিভিন্ন অংশের বিপরীতে আলাদা আলাদা আনুমানিক মূল্য ও মেরামত ব্যয়ের অঙ্ক দেখা যায়। ইঞ্জিন, সাইলেন্সার, রেডিয়েটর, ওয়াটার পাম্প, ফুয়েল সিস্টেম, ইনজেক্টর, ব্যাটারি, স্টার্টার, অল্টারনেটর, গিয়ারবক্স, ডিফারেনশিয়াল, সাসপেনশন, ব্রেক সিস্টেম, টার্বোচার্জার, টায়ার, বডি, ছাদ, যাত্রী সিটসহ বহু আইটেম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু এতগুলো যন্ত্রাংশের বিপরীতে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বাসটির প্রকৃত বাজারমূল্য, অবশিষ্ট ব্যবহারযোগ্য জীবন, পূর্ববর্তী মেরামত ব্যয় এবং বাস্তবে প্রতিস্থাপিত যন্ত্রাংশের পরিমাণ তুলনা করা হয়েছে কি না—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো পুরোনো বাসের মেরামত ব্যয় যদি তার অর্থনৈতিক মূল্যকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেটি মেরামত করা আর্থিকভাবে যৌক্তিক কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
নথিতেই যখন একদিকে বাসটিকে অতি পুরোনো এবং মেরামত-পরবর্তী আর্থিকভাবে অলাভজনক বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল অঙ্কের মেরামত প্রাক্কলন তৈরি হয়েছে—তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি।
৩৩টি অকেজো গাড়ি বিক্রির নথিও সামনে : একই সময়ের নথিপত্রে বিআরটিসির অকেজো ঘোষিত ৩৩টি গাড়ি বিক্রির বিষয়ও উঠে এসেছে। সেখানে মোট বিক্রয়মূল্য হিসেবে ১৬,১১,৫০০ টাকা এবং উৎসে কর কর্তনের অঙ্ক হিসেবে ১,১১,১৫২ টাকা-এর উল্লেখ রয়েছে। ২১/০৪/২০২৬ তারিখের একটি চিঠিতে বিক্রিত গাড়িগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের মনোনীত প্রতিনিধির কাছে ইনভেন্টরি মোতাবেক যথানিয়মে হস্তান্তরের নির্দেশনার কথাও রয়েছে। চিঠিতে বিভিন্ন ডিপোর গাড়ির সংখ্যা ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের তথ্য সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ৩৩টি গাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়া এবং আলোচিত জোয়ার সাহারা বাসটির মেরামত-সংক্রান্ত ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং অকেজো যানবাহনের মূল্যায়ন, মেরামত বনাম বিক্রির সিদ্ধান্ত এবং যন্ত্রাংশের হিসাব—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘অকেজো’ না ‘মেরামতযোগ্য’—সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ ?
প্রাপ্ত কাগজপত্রে আরও একটি বিষয় তদন্তের দাবি রাখে। একটি নথিতে বাসটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ অকেজো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মেরামত আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। আবার অন্য নথিতে একই বাসের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামত/প্রতিস্থাপনের জন্য কয়েক দশ লাখ টাকার হিসাব সামনে এসেছে।
এখন প্রশ্ন— বাসটিকে প্রথমে কেন মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছিল ? তখনকার ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকার প্রাক্কলনের ভিত্তি কী ছিল ? পরবর্তী সময়ে মাত্র এক-দেড় বছরের মধ্যে ব্যয় কেন প্রায় ৮.৪ গুণ বাড়ল ? এই বাড়তি ব্যয়ের জন্য নতুন কোনো কারিগরি সমীক্ষা হয়েছিল কি ? কোন কর্তৃপক্ষ নতুন প্রাক্কলন অনুমোদন করেছে ? প্রতিটি যন্ত্রাংশের ক্রয়মূল্য বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল কি ? বাসটি বাস্তবে কত টাকার কাজ পেয়েছে—তার পরিমাপ বই, ওয়ার্ক অর্ডার, বিল এবং গ্রহণ সনদে কী আছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকার প্রাক্কলনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া কঠিন।
শ্রম ব্যয়ও চাই চুলচেরা যাচাই : শুধু যন্ত্রাংশের বিল নয়, মজুরি ও শ্রম ব্যয়ও এই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একটি পুরোনো বাসের মেরামতে কতজন শ্রমিক কতদিন কাজ করেছেন, প্রতিদিনের মজুরি কত, কোন কাজ অভ্যন্তরীণ কর্মীদের দিয়ে এবং কোন কাজ ঠিকাদার/বাহ্যিক কর্মীদের দিয়ে করানো হয়েছে—এসবের পূর্ণ হিসাব থাকা উচিত।
প্রয়োজনে তদন্তকারীদের মিলিয়ে দেখতে হবে—
মজুরি রেজিস্টার;
শ্রমিকদের উপস্থিতি;
কাজের সময়সূচি;
ওয়ার্কশপ জব কার্ড;
মেরামত কাজের পরিমাপ;
যন্ত্রাংশ গ্রহণ ও বিতরণ রেজিস্টার; ক্রয়াদেশ;
সরবরাহকারীর বিল;
ভ্যাট/কর চালান;
স্টোর রিসিভ ভাউচার;
পেমেন্ট ভাউচার;
ব্যাংক/চেকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের রেকর্ড।
কারণ কাগজে শ্রম ব্যয় দেখানো আর বাস্তবে সেই শ্রম ব্যয় হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে ‘পুরোনো ইনভেন্টরি বনাম নতুন ইনভেন্টরি’র রহস্য : এই ঘটনায় সবচেয়ে কার্যকর তদন্তের পথ হতে পারে একটি Before–After Inventory Audit। অর্থাৎ বাসটি প্রথমবার ওয়ার্কশপে পাঠানোর আগে যে ইনভেন্টরি ছিল, সেটি এবং ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের পরিদর্শন নথি পাশাপাশি রেখে প্রতিটি যন্ত্রাংশের হিসাব মিলিয়ে দেখা।
একটি একটি করে দেখা দরকার—আগে ছিল → পরে আছে কি না → খুললে কোথায় জমা হয়েছে → নতুনটি কেনা হয়েছে কি না → কেনা হলে কত দামে → বাসে লাগানো হয়েছে কি না → পুরোনোটি নিষ্পত্তি হয়েছে কীভাবে।
এই একটি তুলনামূলক অডিটই অভিযোগের বড় অংশের সত্যতা যাচাই করতে পারে।
নথির তারিখ নিয়েও স্পষ্টতা জরুরি : প্রাপ্ত তথ্যের একটি অংশে বাসটির ইনভেন্টরি প্রস্তুতের তারিখ হিসেবে ০৬/০১/২০২৪-এর উল্লেখ রয়েছে, আবার সংশ্লিষ্ট প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে ১০/০৩/২০২৪ তারিখের চিঠি নং ৩১২-এর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। তাই প্রকাশের আগে মূল স্বাক্ষরিত নথি থেকে তারিখগুলো পুনরায় যাচাই করা জরুরি। একইভাবে OCR-রূপান্তরের কারণে রেজিস্ট্রেশন নম্বর, যন্ত্রাংশের নাম ও কয়েকটি আর্থিক অঙ্কে বিকৃতি দেখা যাচ্ছে। ফলে মূল নথির সত্যায়িত কপি, সংশ্লিষ্ট কমিটির স্বাক্ষর এবং অফিসিয়াল হিসাবরক্ষণ রেকর্ড ছাড়া কোনো বিকৃত অঙ্ককে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত হবে না।
এখন প্রশ্ন বিআরটিসির কাছে : এই ঘটনায় বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন—
৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকা থেকে ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা—এই বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির কারিগরি ভিত্তি কী?
মেরামতের আগে ও পরে বাসটির পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি কোথায় ? খোলা পুরোনো যন্ত্রাংশের হিসাব কী ? নতুন যন্ত্রাংশের ক্রয়াদেশ ও বাজারদর যাচাই হয়েছে কি ? ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকার প্রতিটি আইটেমের বিপরীতে বাস্তবে কাজ হয়েছে কি ? মজুরি বাবদ কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কতজন শ্রমিক কতদিন কাজ করেছেন ? মেরামত-পরবর্তী বাসটির বর্তমান মূল্য কত?
মেরামত করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হলে এত বড় অঙ্কের মেরামত প্রাক্কলনের প্রয়োজন কেন হলো ?
শেষ কথা: তদন্তই এখন একমাত্র পথ : একটি সরকারি বাসের মেরামতকে ঘিরে প্রাক্কলনের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন, যন্ত্রাংশের হিসাব নিয়ে অভিযোগ, পুরোনো ও নতুন ইনভেন্টরির অসঙ্গতি এবং শ্রম ও ক্রয় ব্যয়ের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিছক একটি বাসের মেরামতসংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কমে গেছে।
তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।
প্রয়োজনে বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিশেষজ্ঞ, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং স্বাধীন তদন্তকারী দিয়ে বাসটির শারীরিক পরিদর্শন, যন্ত্রাংশের ফরেনসিক ইনভেন্টরি, বাজারদর যাচাই এবং বিল-ভাউচারের অডিট করা যেতে পারে।
কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি বাসের নয়—সরকারি অর্থে কেনা প্রতিটি নাট-বল্টু, প্রতিটি যন্ত্রাংশ এবং প্রতিটি শ্রমঘণ্টার হিসাব জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয়।
আর যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে পুরোনো যন্ত্রাংশ সরিয়ে ফেলা, অস্তিত্বহীন যন্ত্রাংশের বিল তৈরি, অতিরিক্ত মেরামত ব্যয় দেখানো কিংবা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই প্রত্যাশা।
এখন দেখার বিষয়, ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকা থেকে ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকার এই অস্বাভাবিক যাত্রার পেছনে আসলে কী আছে—কারিগরি বাস্তবতা, হিসাবের ভুল, নাকি সরকারি অর্থের ওপর আরেকটি অদৃশ্য হাত?

