
মোঃ নজরুল ইসলাম: দুর্নীতি ও ক্ষমতার দাপট একটি অপ্রিয় চরম সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে, যা সমাজ থেকে সহজে নির্মূল করা সম্ভব নয়। দুর্নীতির কারণে সমাজের প্রশাসনিক এবং সরকারি গোষ্ঠী লাভবান হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের উদ্যোক্তারা বর্তমানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন ব্যবসা শুরু থেকে পরবর্তীতে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া ও নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি, বিশেষ ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ এবং অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়েছেন পলওয়েল কারনেশন শপিং সেন্টার উত্তরা মার্কেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কবির হোসেন খান নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযোগ অনুযায়ী, কবির হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ (যা তিনি উপহার বলেন) পুলিশের নিজস্ব দোকান ও অফিস স্পেস ভাড়া দিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া।দোকান ভাড়া ও গোল্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গোল্ড বাকিতে নেওয়া এবং সেই গোল্ড ব্যবসায়ীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের সাথে আলোচনা না করে মার্কেটে কেউ দোকান ভাড়া নিতে পারে না। পুলিশ কর্মকর্তা কবির হোসেনের দুইজন পুলিশের কনস্টেবল’সহ নিজস্ব সিন্ডিকেট দ্বারা বিভিন্ন ভাবে ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের হুমকি ও নানাভাবে হয়রানি’সহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়েছেন এই কবির হোসেন।
পলওয়েল মার্কেট ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, মার্কেটে দোকান মালিকদের নিরুৎসাহী করে দোকান বিক্রি করানো এবং পরবর্তীতে তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বায়না করে মোটা অংকের দালালি নিয়ে অন্য জনের কাছে বিক্রি করার সাথে ও জড়িত কবির হোসেন। তার অপকর্মে ভুক্তভোগী হচ্ছেন পলওয়েল মার্কেটের সাধারণ ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকেরা।
পলওয়েল কারনেশন মার্কেটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ভুক্তভোগী
দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, পলওয়েল মার্কেট বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম মার্কেট। মার্কেটের ভিতরের বাহিরের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে কিন্তু এই মার্কেটে পরিচালনার দায়িত্বে অতীতে যারা এসেছেন তারা যেমন দুর্নীতিতে এবং নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করেছেন একই নীতিতে এই কবির হোসেন ও তার সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে।
তারা আরো বলেন, কবির হোসেন ও তার সিন্ডিকেট পুলিশের নির্ধারিত দোকান অফিস স্পেস ভাড়া দেওয়ার সময়, যারা ভাড়া নিতে আসে তাদের কাছে থেকে মিষ্টি খাওয়ার কথা বলে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন কবির সিন্ডিকেট।
মার্কেটে কবির সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন দুইজন কনস্টেবল ও একজন গোল্ড ব্যবসায়ী সাকিব, জানা যায় এই সাকিবের স্ত্রীর সাথে কবির হোসেনের রয়েছে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সাকিবের দোকান থেকে মোটা অংকের গোল্ড নিয়েছেন কবির হোসেন। সাকিবের স্ত্রীর সাথে গভীর সম্পর্ক থাকায় মার্কেটের চতুর্থ তালায় পাঁচটি দোকান ভাড়া নেওয়ার সুবিধা করে দিয়েছেন কবির হোসেন। মার্কেট ব্যবসায়ীরা ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, পাঁচটি দোকানের একটি দোকানের ও সার্ভিস চার্জ ও জমিদারী বিল পরিশোধ করেন না সাকিব এবং উর্মি। চতুর্থ তালার ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, সাকিব গত ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে চোরাই গোল্ড বিক্রির দায়ে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। সাকিব চতুর্থ তলায় গোল্ডের ব্যবসার নামে মূলত কিশোর গ্যাং দিয়ে ইয়াবার ব্যবসা পরিচালনা করছেন, চতুর্থ তালায় দোকান ভাড়া নিতে আসলে যেন দোকান ভাড়া না নিতে পারে ব্যবসায়ীরা সেজন্য তাদেরকে নিরুৎসাহী করে ফেরত পাঠান। মার্কেটের চতুর্থ তলায় দোকান ভাড়া নিতে বাধার সৃষ্টি করেন সাকিব।
পলওয়েল মার্কেটের আরেকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, আমাদের মার্কেটের বাহিরে দুই সাইডে বড় বড় দুইটি বিলবোর্ড আছে, যেগুলো ভাড়া নেওয়ার জন্য আমি কনস্টেবলদের কাছে যাই, যেন উনারা আমার কাছে এই বিলবোর্ড দুইটি ভাড়া দেন এবং আমরা সুন্দর লাইটিং করে বিলবোর্ড দুইটি চালু করি, যাতে মার্কেটে সৌন্দর্য বাড়ে কিন্তু দুঃখের বিষয় এখানেও আমার কাছে বড় অংকের টাকা দাবি করেন এই কবির হোসেনের সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে আমি এই কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখি।
তরুণ উদ্যোক্তাদের ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও ওঠে কবির হোসেন এর বিরুদ্ধে। তিনি মার্কেটে একটি গ্রুপ সিন্ডিকেটের সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন। সুদের ব্যবসা, দোকান ক্রয়-বিক্রয়, কবির হোসেনের কথা মত না চললে চলমান দোকান থেকে উঠিয়ে আরেকজনকে ভাড়া দেওয়ার হুমকি ও দেওয়া হয়। এখানে কবির সিন্ডিকেট সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, দোকান মালিকদের দোকান ভাড়া না হওয়ায় অনেক দোকানের জমিদারি বিল ও সার্ভিস চার্জ জমে গেছে, সেই দোকান মালিকদের ডেকে ভয় ভীতি দেখিয়ে মার্কেট কখনো জমবে না, এই ধরনের অপপ্রচার করে সেই দোকান তার লোক দিয়ে বায়না করে পরবর্তীতে দালালি করে বেশি টাকায় অন্যত্র বিক্রি করার বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন কবির হোসেন।
এরকম নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে পুলিশ কর্মকর্তা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। মার্কেটের চতুর্থ তলার কয়েকজন ব্যবসায়ীকে কবির হোসেন বলেন, আমার অনেক পাওয়ার আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে পুলিশের ডিআইজিরা মাঠে হাটে আর কথা বলে। পলওয়েল নিয়ে আমি যা বলব তাই হবে এখানে অন্য কেউ ডিস্টার্ব করলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। (এই ধরনের এসএমএসের কয়েকটি স্ক্রিনশট সাংবাদিকদের হাতে এসেছে)। কবির হোসেনের অত্যাচার অতিষ্ট হয়ে পুলিশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিঃ বরাবর একটি অভিযোগের চিঠি দিয়েছেন ভুক্তভোগী কয়েকজন ব্যবসায়ীরা। কবির হোসেনের নামে চিঠি দেওয়ার কারণে, কবির হোসেন মার্কেটে এসে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ডেকে এনে অনেক ভয়-ভীতি দেখিয়েছে এবং বলে গিয়েছে তারা কিভাবে এই মার্কেটে থাকে সেটা তিনি দেখে নিবে। অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা অনেক আতঙ্কে মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা যায় ।
সরজমিনে মার্কেটে ঘুরে দেখা যায়, পলওয়েল সুন্দর একটি মার্কেটে বড় ধরনের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন এই পুলিশ কর্মকর্তারা। সিন্ডিকেটের বিষয়টি নিয়ে মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কবির হোসেনের ভয়ে মার্কেটে কেউ কথা বলতে পারে না, মার্কেটে বেচা-কেনা খুবই কম, অনেকের তিন মাস, চার মাস এমনকি এক বছর পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ ও জমিদারি বিল বাকি রাখে, যদি কেউ কোন কথা বলে তাহলে সাথে সাথে তার দোকানে লাইন কেটে দেওয়া হয়। যারা কবির হোসেনের সাথে সিন্ডিকেট করে চলেন তাদেরকে সার্ভিস চার্জ জমিদারী বিল বছরে ১ বার দিলেও কোন সমস্যা হয় না বলে জানা যায়।
পলওয়েল সূত্র জানায়, পুলিশ কর্মকর্তা কবির হোসেনের সাথে সু সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন উর্মি। এই উর্মি আক্তার পুলিশ কর্মকর্তা কবির হোসেনের পরিচয় ব্যবহার করে মার্কেটের অন্যান্য উদ্যোক্তাদের দোকান বরাদ্দ নিতে নিরুৎসাহিত করেন। উর্মি আক্তারের কথার অমতে দোকান বরাদ্দ নিলে পুলিশ কর্মকর্তা কবির হোসেন এর পাওয়ারে কিশোর গ্যাং দ্বারা বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং দোকান ছেড়ে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন থাকেন। ভুক্তভোগী একজন নারী উদ্যোক্তা বলেন সাকিব ও উর্মীর অন্যায়ের কোন বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলেই সাথে সাথে কবির হোসেন ফোন দিয়ে তার কনস্টেবলদেরকে পাঠিয়ে আমাদেরকে হুমকি দেয় এবং পরবর্তীতে বাহিরে থেকে কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের এনে আমাদেরকে হুমকি প্রদান করেন। ভুক্তভোগী মহিলা উদ্যোক্তাকে সাকিব ও উর্মীসহ তার কর্মচারীরা মারতে আসে এবং তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। (হুমকি ও মারতে আসা কিছু ভিডিও ফুটেজ সাংবাদিকদের হাতে এসেছে) এই ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় কিছুদিন আগে একটি অভিযোগ দায়ের করেন মাসুদা নামে একজন উদ্যোক্তা, সেখানেও অদৃশ্য কারণে কবির হোসেন সেই অভিযোগটি আটকে রেখেছেন থানা পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ভুক্তভোগী মহিলা উদ্যোক্তা মাসুদা পুলিশের হেড অফিস বরাবর ও পলওয়েল কারনেশনের দোকান মালিক সমিতি বরাবর একটি চিঠি দিয়ে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। কিন্তু পলওয়েল হেড অফিস বরাবর যে চিঠিটি দেয়া হয়েছে কবির হোসেন সেই চিঠিটিও আটকে রেখেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছাতে দেননি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী মাসুদা । কবির হোসেন সিন্ডিকেটের সাকিব ও উর্মিকে বাঁচানোর মরন কামড়ে মেতে উঠছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মার্কেট ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছি আমরা, কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করলে দোকানে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দেয়, থানা পুলিশের ভয় দেখায়, মামলা দিয়ে জেলে ভরে দিবে সেই ভয় দেখায়। বলে ৪-৫ জন পুলিশের ডিআইজির সাথে আমি প্রতিনিয়ত কাজ করি কেউ আমাকে কিছু করতে পারবা না বলেও হুমকি দেয় কবির হোসেন।
মার্কেটের সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুলিশ কর্মকর্তার আশ্রয় প্রশ্রয়ে উর্মি আক্তার প্রভাব এতটাই বেশি যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিচার পযর্ন্ত দিতে ভয় পায়। জানা যায় সাকিব ও উর্মির গোল্ডের দোকানে চুরি হয়, সে বলে তার দোকানে ৭০ লক্ষ টাকার গোল্ড ছিল, সরজমিনে দেখা যায়, গোল্ড এর চেয়ে তার দোকানে গোল্ড প্লেট বেশি এবং তিনি পুরানো গোল্ড কেনা-বেচা করেন।
প্রতিবেশী দোকান মালিকরা বলেন, সর্বসাকুল্যে তার দোকানে ১০/১৫ লক্ষ টাকার গোল্ড আছে। তিনি ৭০ লক্ষ টাকার গোল্ড ক্রয় করেছেন তার কোন মেমো পাওয়া যায়নি সে দেখাতেও পারবেনা। মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দোকানে চুরির ঘটনার সম্পূর্ণ সাজানো নাটক এবং সাজানো নাটক কেন্দ্র করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারদের কাছে সহানুভূতি নিয়ে, পলওয়েলের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে নিজে অনৈতিক সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন এই সাকিব ও উর্মি এবং কবির হোসেন সিন্ডিকেট।
কবির হোসেন ও তার সিন্ডিকেটের যন্ত্রণায় অতিষ্ট ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা ফুঁসে উঠেছে যে কোন সময় তারা মানববন্ধন সহ যে কোন আন্দোলনে যেতে পারেন।
এবং তারা দাবি করেছেন পলওয়েল কর্তৃপক্ষের কাছে যাতে কবির হোসেন সহ দুইজন কনস্টেবল কে অবিলম্বে এখান থেকে প্রত্যাহার করে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হোক এবং মার্কেটকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের কাছে আবেদনও করেন।

