
ডেস্ক নিউজ : সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানবান্ধব নীতি প্রণয়নের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘বেইলা ফিউচার সামিট-২০২৬’ এর সমাপনী অধিবেশনে মাহ্দী আমিন একথা বলেন।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যার নীতি ও পরিকল্পনাগুলো দেশের সবচেয়ে বড় অংশ—তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভূমিকা রাখবে। তরুণ প্রজন্ম প্রকৃতপক্ষে কী চায়? তারা প্রথমত এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করে যেখানে তাদের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বিকশিত করার মতো উপযোগী নীতি থাকবে। সকলেই এমন একটি শাসনব্যবস্থা চায়, যা ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানবান্ধব নীতি প্রণয়ন করবে। এর প্রতিফলনস্বরূপ সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটে আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কীভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্সের (বেইলা) আয়োজনে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে প্রায় দেড় হাজার অংশগ্রহণকারী, পাঁচ শতাধিক শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা (সিএক্সও), পোশাক খাতের উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা এবং দেশি-বিদেশি অতিথি অংশ নেন।
নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, আপনাদের অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মৌলিক দাবি হলো এমন একটি সমন্বিত পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, বন্ডেড সুবিধার প্রক্রিয়া আরও সহজতর হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং ব্যবসা পরিচালনায় সহজলভ্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে। দুর্ভাগ্যবশত, বিগত বহু বছর ধরে আমরা এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত ছিলাম। তাই নতুন সরকার হিসেবে আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমাদের পক্ষ থেকে এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আনয়নে সর্বোচ্চ প্রয়াস থাকবে।
রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রে সুশাসনের দুটি মূল ভিত্তি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আমরা কীভাবে নিশ্চিত করতে পারি, সেটাই মূল বিষয়। আমরা এমন উন্নয়ন চাই যা সার্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে গ্রাম ও শহরের মধ্যকার বৈষম্য ও ব্যবধান দূর করা সম্ভব হবে। বৈষম্য নিরসনে আমাদের প্রকল্পগুলোতে অধিকতর ন্যায্যতা ও সমতা থাকতে হবে, প্রকল্পগুলোকে হতে হবে ন্যায়বিচারমুখ। মেগা প্রকল্পের অন্তরালে যে মেগা দুর্নীতির সংস্কৃতি আমরা বিগত সময়ে দেখেছি, তা থেকে আমাদের পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। এ কারণেই সরকারের মূল নীতি অবকাঠামোগত, নিছক ইট, কাঠ, রড বা সিমেন্টে বিনিয়োগ করা নয়।
সরকারের মূল বিনিয়োগ তরুণ মানবসম্পদের পেছনে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যেই আমরা বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। যারা তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে যুক্ত তারা সকলেই অবগত আছেন যে, সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাদের দক্ষতার ঘাটতি। কীভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের কর্মীদের দক্ষতা আরও উন্নত করতে পারি, যেন আমরা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি সেটিই আমাদের লক্ষ্য। উপরন্তু, বহু ক্ষেত্রে আমাদের ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও অনেক বেশি।
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের হয়তো একমাত্র সুবিধা হলো তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়। তবে সময়ের পরিক্রমায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানাবিধ কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। আমাদের বর্তমান মেয়াদে ধাপে ধাপে এই ব্যয় ও জটিলতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করব।
মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি যেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে প্রদর্শিত উদ্ভাবনী ধারনার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র।
তিনি বলেন, আমরা যেমন এক সময়ের বৃহদাকার মুঠোফোন থেকে আজকের আধুনিক স্মার্টফোনে রূপান্তরিত হয়েছি, যা ছিল একটি সময়োপযোগী উদ্ভাবন, ঠিক তেমনি আমাদের পোশাক তৈরির কারখানাগুলোও একসময় ফ্যাক্স বা ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ হতো, যা এখন হোয়াটসঅ্যাপে রূপ নিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও নতুন প্রযুক্তি আসবে, যার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই তথ্যের আদান-প্রদান সম্ভব হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, একইভাবে আমাদের প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করতে হবে তা প্রসেস বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন হোক কিংবা পণ্যের উদ্ভাবন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন হোক না কেন। একটি অর্ডার চূড়ান্ত করার পূর্ববর্তী ধাপসমূহ যেমন প্রকল্প ও পণ্য পর্যায়ে পোশাকের নকশা, গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, লজিস্টিকস এবং পরিশেষে, বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া শেষে অর্থপ্রাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সংযুক্তি অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু আমাদের একটি ব্যয়গত সুবিধা রয়েছে, তাই জনবল বা কর্মীদের এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে যেন প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে আমাদের সেই মূল সুবিধাটি নস্যাৎ না হয়ে যায়।
তিনি বলেন, আমাদের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে দক্ষতা বাড়াতে এবং একই সাথে যেন কোনো বেকারত্ব সৃষ্টি না হয়। মূলত, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের প্রধান লক্ষ্যই হলো দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, যেন বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। একই সাথে আমরা চাই ব্যবসায়ের সার্বিক পরিধি ও ব্যাপ্তি এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে, যাতে করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
সরকার নীতিগত দিক থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউজের নবায়ন সংক্রান্ত যে জটিলতা পূর্বে বিদ্যমান ছিল, নতুন উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের জন্য আমরা তা অত্যন্ত সহজ করে দিচ্ছি। একই সাথে বিদ্যমান নিয়মকানুন শিথিল করা হচ্ছে এবং শুল্কসংক্রান্ত নানান সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্বে প্রণোদনা বা ইনসেন্টিভ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হতো, কিন্তু প্রথমবারের মতো আমরা দ্রুততম সময়ে এই প্রণোদনা হাতে পৌছানোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত ও সৎ ব্যবসায়ী, যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন তাদের জন্য ব্যয়সংকোচন ও সহায়ক নীতি গ্রহণ করা।
মাহ্দী আমিন বলেন, সার্বজনীন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অংশ হিসেবে আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো সেটি হতে পারে তৈরি পোশাক শিল্প, বস্ত্র কিংবা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পই হোক না কেন পুনঃরায় চালু করা এবং সৎ ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা। সরকার হিসেবে আমরা
দিকনির্দেশনামূলক নীতি নির্ধারণ করতে পারি, তবে আসল উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি হতে হবে বেসরকারি খাত কেন্দ্রিক। আমরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই এবং প্রয়োজনবোধে বেসরকারীকরণের দিকেও অগ্রসর হতে চাই। আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। আপনারা যত বেশি যৌথ উদ্যোগের প্রকল্প গ্রহণ করবেন, আমরা মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক সহজতর করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের তিনটি অনন্য সুবিধাজনক দিক রয়েছে। প্রথমত, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী তথা আমাদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার, যেখানে যেকোনো শিল্প কারখানা সহজেই তাদের পণ্য বিপণন করতে পারে। এবং তৃতীয়ত, বহু বছর পর অর্জিত একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা ও জাতীয় স্বার্থ বজায় থাকবে।
এই তিনটি সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরও যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে, তা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। বহু কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট বিদ্যমান। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া আমরা যে বন্দর ব্যবস্থাপনা পেয়েছি, তা নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে পণ্য খালাস এবং আমদানিরীতি সম্পূর্ণ করতে সময় ও ব্যয় দুটোই বেশি লাগে। আমরা এই ব্যবস্থার দ্রুত সংস্কারে কাজ করে যাচ্ছি। সার্বিকভাবে আমরা এমন একটি গতিশীল ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই, যা আপনাদের উদ্যোক্তাসুলভ আচরণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ সমর্থনের পাশাপাশি উৎসাহিত করবে। আমরা এমন একটি যৌথ যাত্রা শুরু করতে চাই, যেখানে দেশের তরুণ সমাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের তরুণ-তরুণীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারের উন্নয়ন নীতিতে নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা সকলে মিলে একযোগে একটি সর্বজনীন, ন্যায্যতা, সমতা ও ন্যায়বিচারপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

