
ক্রীড়া ডেস্ক : ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন এক বড় বিতর্কের মুখোমুখি। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা ২০২৬ বিশ্বকাপেই যে নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন, তা তিনি আগেই নিশ্চিত করেছিলেন। তবে মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে চলমান সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কবে ফুটবল ছাড়বেন সেটি কেবল তিনিই ঠিক করবেন, বাইরের কেউ নয়। স্পেনের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে রোনালদো বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কথা বলেছেন।
গত ২৩ বছর ধরে সমালোচকরা তাকে দল থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন রোনালদো। তিনি বলেন, এতদিন ধরে সমালোচনার তীর ধেয়ে এলেও তা তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি বরং এসব সমালোচনা তাকে আরও পরিপক্ক হতে সাহায্য করেছে। দেশের হয়ে নিজের শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো আক্ষেপ রাখতে চান না। মাঠে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি জানান, ফলাফল যাই হোক না কেন, পূর্ণ তৃপ্তি নিয়েই মাঠ ছাড়তে চান এই পর্তুগিজ আইকন।
দলীয় কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে রোনালদো তার সামর্থ্য প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। এবারের বিশ্বকাপে তিনি তিনটি গোল করলেও তার খেলার ধরনে গতি কমেছে এবং বলের স্পর্শও আগের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে নকআউট পর্যায়ে গোল করার জন্য তিনি পেনাল্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, যা দলের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। মার্টিনেজ অবশ্য তার অধিনায়কত্বের প্রশংসা করে তাকে দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখছেন।
রোনালদোকে নিয়ে পর্তুগাল সমর্থকদের আবেগের কোনো কমতি নেই। তাকে ছাড়া পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন। সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, রোনালদো যতক্ষণ চাইবেন, ততক্ষণই তার দলে থাকা উচিত। কারণ, পর্তুগালকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি এনে দেওয়ার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তাকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি অনেক ভক্তই মেনে নিতে পারছেন না বরং তার শেষ বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকুক এমনটাই প্রত্যাশা করছেন তারা।
অন্যদিকে, সমালোচকদের যুক্তি রোনালদো এখন দলের সম্মিলিত খেলার চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিকেই বেশি মনোযোগী। অতীতে রোনালদোকে ছাড়া খেলা কয়েকটি ম্যাচে পর্তুগাল বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল, যা পরোক্ষভাবে দলের কৌশলের ওপর প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান পর্তুগাল দল তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর ভিত্তি করে সাজানো উচিত, যেখানে রোনালদোর ভূমিকা হতে পারে একজন সুপার সাব হিসেবে।
স্পেনের বিপক্ষে আজকের ম্যাচটি রোনালদোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। দল তাকে মূল একাদশে রাখবে নাকি গোঞ্জালো রামোসের মতো তরুণ তুর্কিকে সুযোগ দেবে; তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা চলছে। গত ম্যাচে রামোসের বদলি হিসেবে নেমে গোল করার পর তরুণ এই স্ট্রাইকারের দাবি আরও জোরালো হয়েছে, যা কোচ মার্তিনেজের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে পর্তুগালের হয়ে এটিই কি রোনালদোর শেষ প্রদর্শনী? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন স্বয়ং রোনালদো নিজেই। তিনি মনে করেন, খেলোয়াড় হিসেবে তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন এবং কোনো ট্রফি তাকে বড় কিংবা ছোট বানাতে পারবে না। ভক্তদের ভালোবাসা আর সমালোচকদের কটু কথা; সব মিলিয়ে রোনালদো এখন এক অনন্য উচ্চতায়, যেখানে তিনি কেবল নিজের ইচ্ছায় বিদায় নিতে চান।
পরিসংখ্যান বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে রোনালদো আজ মাঠে নামবেন স্পেনের বিপক্ষে। পর্তুগালের কোটি ভক্তের চোখ থাকবে তাদের প্রিয় তারকার দিকে, যিনি গত দুই দশকে পর্তুগিজ ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আজকের ম্যাচটি যদি সত্যিই রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হয়, তবে তার বিদায়টা হবে এক মিশ্র অনুভূতির সাক্ষী, যেখানে ফুটবল বিশ্ব দেখবে এক কিংবদন্তির সূর্য ডোবার দৃশ্য।

