
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সোমালিয়ায় খরা, আকস্মিক বন্যা, সংঘাত ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির ৬৫ লাখের বেশি মানুষ এখন তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে। এটা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অনেক পরিবার জীবন বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাজধানী মোগাদিশুর আশ্রয়শিবিরে এলেও সেখানে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।
দেশটির মধ্যাঞ্চলের বুরহাকাবা এলাকার বাসিন্দা জয়নাব ইব্রাহিম টানা তিন বছর খরা দেখেছেন। বৃষ্টি না হওয়ায় জমি শুকিয়ে যায়, ফসল নষ্ট হয়, আর পানি ফুরিয়ে যায়। তার গ্রামে ক্ষুধা ও রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এতে তার ১০ সন্তানের মধ্যে চারজন মারা যায়। তিনি বলেন, জীবন বাঁচাতে আমরা সবরকম চেষ্টা করেছি—শুকনো ঘাস বিক্রি করেছি, মাটি খুঁড়ে পানি তুলেছি। কিন্তু কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের বাঁচাতে পালিয়েই আসতে হয়েছে। এখন তিনি মোগাদিশুর কাহদা এলাকার একটি শিবিরে ছয় সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি অস্থায়ী ঘরে থাকেন।
এমন পরিস্থিতির শিকার ৭৭ বছর বয়সী আদান রোবলেও। দীর্ঘ খরায় তার জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এরপর গত মাসে প্রবল বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা হলে তার গ্রাম ভেসে যায়। ওই সময় এলাকাজুড়ে সরকারি বাহিনী ও আল-শাবাবের যুদ্ধ চলছিল, মাথার ওপরে ঘুরছিল ড্রোন।
তিনি বলেন, সবকিছু হারিয়ে খাবার ও পরিষ্কার পানি ছাড়া বেঁচে থাকা, আর চারদিক থেকে যুদ্ধ—এই বাস্তবতা খুব ভয়ংকর। নিরাপত্তাহীনতা ও সাহায্যের অভাবে তাকেও গ্রাম ছেড়ে পালাতে হয়। এখন মোগাদিশুতে ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ অস্বাস্থ্যকর ও ভিড়াভিড়ি পরিবেশে বসবাস করছে। সেখানে পানি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে শিশুরা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৯ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। অর্থের অভাবে প্রায় ৫০০ পুষ্টিকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক শিশু চিকিৎসা পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, গত তিন মাসে কিসমায়ো হাসপাতালের বিশেষ বিভাগে ৭০০-এর বেশি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ জন মারা গেছে।
এই সংকট আরও খারাপ হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। এটা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সম্প্রতি বলেন, জলবায়ু সংকট, সংঘাত আর বন্যা-খরা একসঙ্গে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। অর্থের অভাবে সাহায্য সংস্থাগুলোও ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। সব মিলিয়ে সোমালিয়া এখন গভীর এক সংকটের মধ্যে রয়েছে, যেখানে মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্যই প্রতিদিন সংগ্রাম করছে।

